ব্রেকিং নিউজ:

ঝড়ো হাওয়ায় 'মা' শক্ত করে বুকে আগলে রাখেন

মদিনা জাহান রিমিঃ ২০১৫-০৫-১০ ১২:২৫:০২

আমি মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে আছি। ভীষণ মায়া হচ্ছে, যে মায়া চোখে পানি নিয়ে আসে সেই মায়া।

মা চোখ বন্ধ করে ঘন ঘন নিঃশ্বাস ফেলছেন, আমি মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে আছি।  নিজের প্রতি অস্বাভাবিক অযত্ন তার মুখ দেখলেই স্পষ্ট বুঝা যায়। ভীষণ মায়া হচ্ছে, যে মায়া চোখে পানি নিয়ে আসে সেই মায়া। আমি শক্ত হয়ে বসে মায়ের মাথায় হাত বুলাই, শক্ত হাতে মা আমাকে এতো বড় করেছেন, এখন তাই আমাকে শক্ত হাতে মায়ের সামনে আসা সব ধরণের কষ্ট ঝাঁকিয়ে ফেলে দেয়া শিখতে হবে।

বড় বেশী অসময়ে আমার বাবা, মাকে ছেড়ে জান্নাতে চলে গেছেন। মায়ের জীবনে বাবার মৃত্যুটা একটা প্রলয়ংকারী ঝড়ের মতো ছিল। সেই ঝড় সামলে উঠতে প্রাণপণ চেষ্টা করা মায়ের অসুস্থ মুখ দেখে কেঁপে- কেঁপে কান্না আটকাই।

তপ্ত রোদে টিফিন বক্স নিয়ে স্কুলের গেটে দাঁড়িয়ে থাকতো যে মা,  তার খুশীর উপসর্গ বাড়ানোর জন্য আমি চেষ্টা করি। SSC পরীক্ষার জন্য ফর্মফিলাপের সময় হুট করেই মায়ের হাত শূন্য, চুপ করে বাবার দেয়া শেষ স্বর্ণের চেনটা বিক্রি করে সে আমাকে টাকা এনে দিলো। আমি জিপিএ ৫ পেলাম। যার সঙ্গেই দেখা হয় মা ধরে ধরে বলে ‘আমার মেয়ে জিপিএ ৫ পেয়েছে’।

২০১০ সালে আমার মায়ের টিউমার অপারেশন হল তখন আমি ঢাকায় নতুন। পথ ভালো চিনি না। অপারেশন থিয়েটারে ঢুকে যাবার পর নার্স এসে বলে গেলো এই মুহূর্তে রক্ত লাগবে। আমার মাথা খারাপ অবস্থা, পরিচিতদের সবার কাছে খোঁজ নেয়া হল কারো সাথেই রক্তের গ্রুপ মিলে না।  রক্তের সন্ধানে আমি সোজা ভার্সিটির সামনে যাই হন্তদন্ত হয়ে। আমার বন্ধু সিদ্দিক সন্তু রক্ত দিলো। আমি আমার এই বন্ধুর প্রতি চির কৃতজ্ঞ হয়ে গেলাম। ওকে “ভাইজান” ডাকা শুরু করলাম। বন্ধু তোকেও জানাই স্যালুট!

সব মায়েরা বাচ্চাদের ছড়াগান গেয়ে শুনায়, কিন্তু আমি বড় হয়েছি প্রতি সন্ধ্যায় মায়ের গাওয়া রবীন্দ্রসংগীত শুনে। এক সন্ধ্যায় মা গান থামিয়ে আমাকে বলল-

- মামনি মানুষের জীবনে দুঃসময় আসে, তোমার জীবনেও আসতে পারে, দুঃসময় এলে কখনো ভেঙে পরবে না, কিছুই হয় নাই এমন একটা ভাব করে দুঃসময়কে অপমান করে তাড়িয়ে দেবে, পারবে না?

- আমি চেষ্টা করবো কিন্তু দুঃসময় যদি যেতে না চায় তখন কি করবো আম্মু?

- অবশ্যই যাবে! দুঃসময়ের পরে শুভ দিন আসে এটা প্রকৃতির নিয়ম। সব সময় শুভ দিনের জন্য অপেক্ষা করবে। তোমার আব্বু আল্লাহ্‌র কাছে চলে যাওয়ায় আমরা একা হয়ে গেছি। আমাদের এখন দুঃসময়।

এক সন্ধ্যায় আমার মায়ের ১০৫ ডিগ্রি জ্বর। আমি মাকে জলপট্টি দিয়ে দিচ্ছে। তন্দ্রাচ্ছন্ন মা বলে-

- আর দিও না, তোমার ঠাণ্ডা লেগে যাবে!  

আমি কিছু বলি না, শুধু ভাবতে থাকি পৃথিবীর সব মায়েরাই মায়াবতী, কিন্তু আমার মা সেই সব মায়াবতীদের অধিনায়ক হবার মতো।

আমার মা বৃষ্টিতে ভিজতে পছন্দ করেন, রান্না করতে পছন্দ করেন। কিন্তু ১০-১২ রকমের শারীরিক অসুস্থতা তাকে গৃহবন্দী করে রেখেছে। মেয়ে হিসেবে মায়ের ভালোবাসার মর্যাদা আমি হয়তো ঠিক মতো দিতে পারি নাই। আমার লেখা প্রথম উপন্যাসের বই তাকে উৎসর্গ করা, লজ্জায় সেটিও তাকে বলতে পারি নাই। তবু সে আমাকে নিয়ে গর্ব করে, অকারণ সে এক অদ্ভুত গর্ব! মা, তোমার জন্য কিছু করার যোগ্য হওয়া পর্যন্ত আমাকে সময় দেবে তো?

===============================================================

লিখেছেন মদিনা জাহান রিমি । 
রিমি আমাদের একজন নিয়মিত পাঠক এবং শুভাকাঙ্ক্ষী। তার লিখা ইনসমনিয়া এবারের বই মেলায়-২০১৫  সর্বাধিক বিক্রিত বইয়ের তালিকায় সেরা দশে রয়েছে।
লেখাটি ভালো লাগলে বা তার আরও লেখা পড়তে চাইলে আমাদের জানাতে পারেন। পাশাপাশি আপনারাও লেখা প্রকাশ করতে চাইলে আমাদের লিখে পাঠাতে পারেন এই ঠিকানায়- sajib@shobshomoy.com
 

লেখাটি শেয়ার করে আপনার বন্ধুদের কেও পড়ার সুযোগ করে দিন।
***ফেসবুকে আমাদের সাথে থাকতে এখানে ক্লিক করুন***
অসমাপ্ত গল্প…... ১
প্রকৃতি’র মেগাপিক্সেল
বৈশাখ থাকুক প্রাণের মাঝে
ভোর এবং তুমি
শুভ্র প্রতিবিম্ব


এই বিভাগের আরও সংবাদ