আসন্ন ঈদুল আজহার আগে পশ্চিমবঙ্গে গরু নিয়ে কড়াকড়িতে হিন্দু খামারি ও গরু ব্যবসায়ীদের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য ফেডারেলের প্রতিবেদনে এমন দাবি করা হয়েছে।
দ্য ফেডারেলের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাত দশকের পুরোনো পশু জবাই আইন কঠোরভাবে কার্যকর করতে গিয়ে অপ্রত্যাশিত প্রতিক্রিয়ার মুখে পড়েছে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের নবনির্বাচিত বিজেপি সরকার। হিন্দু খামারি ও গরু ব্যবসায়ীদের দাবি, এই সিদ্ধান্তে গ্রামীণ প্রাণিসম্পদ অর্থনীতি বিপর্যয়ের মুখে হয়ে পড়েছে, যার ওপর নির্ভরশীল হাজারো মানুষের জীবিকা।
শুভেন্দু অধিকারী সরকার গত সপ্তাহে পশ্চিমবঙ্গ পশু জবাই নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৯৫০’ কঠোরভাবে কার্যকর করার নির্দেশ জারি করে। ওই আইনে বলা হয়েছে, গরু জবাইয়ের আগে স্থানীয় প্রশাসন ও সরকারি পশু চিকিৎসকের যৌথভাবে দেওয়া ‘জবাই উপযোগী’ সনদ নেওয়া বাধ্যতামূলক। পাশাপাশি গরু ও মহিষ পরিবহন এবং প্রকাশ্যে জবাইয়ের ওপর বিধিনিষেধও জোরদার করা হয়েছে।
ঈদের মাত্র সপ্তাহ তিনেক আগে নেওয়া এই পদক্ষেপের ফলে দক্ষিণ ২৪ পরগনা, নদিয়া, মুর্শিদাবাদ ও বীরভূমের মত জেলার ক্ষুদ্র খামারিদের মধ্যে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। এসব এলাকায় বহু খামারি প্রতিবছর ঈদের মৌসুমে বয়স্ক বা দুধ দেওয়া বন্ধ করে দেওয়া গরু বিক্রি করে সেই টাকায় নতুন গবাদিপশু কেনেন।
দক্ষিণ ২৪ পরগনার ভাঙড় এলাকার বামনগাছির খামারি শশাঙ্ক মণ্ডল বলেন, গবাদি পশুর অর্থনীতি সম্পর্কে সরকারের কোনো ধারণাই নেই। থাকলে ১৯৫০ সালের এই আইন কার্যকর করার আগে অন্তত তারা আমাদের সময় দিত। বয়স ও আকারভেদে প্রতিটি পশুর পেছনে আমাদের প্রতিদিন ২০০ থেকে ৩০০ রুপি খরচ হয়। একটি গরু ১৪ বছর পর্যন্ত বাঁচেই না, অথচ সরকার বলছে পশু বিক্রির ন্যূনতম বয়স ১৪ বছর হতে হবে। এর আগেই যেসব গরু দুধ দেওয়া বন্ধ করে দেয়, সেগুলো নিয়ে আমরা কী করব? প্রতি বছর ঈদের সময় আমরা বয়স্ক গরু বিক্রি করি এবং সেই টাকার একটি অংশ দিয়ে নতুন গরু কিনি।
আইন অনুযায়ী, কেবল তখনই একটি গবাদি পশু জবাই করা যাবে, যখন কর্তৃপক্ষ সনদ দেবে যে পশুটির বয়স ১৪ বছরের বেশি এবং সেটি কাজ বা প্রজননের অনুপযুক্ত, অথবা আঘাত, বিকলাঙ্গতা বা দুরারোগ্য ব্যাধির কারণে স্থায়ীভাবে অক্ষম।
দ্য ফেডারেল লিখেছে, আইন কঠোরভাবে কার্যকর হওয়ায় মৌসুমি গরুর বাজার কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। ব্যবসায়ী ও ক্রেতারা আইনি জটিলতা এবং উগ্রবাদী গোষ্ঠীর তৎপরতার আশঙ্কায় পিছিয়ে যাচ্ছেন।
ভাঙড়ের বামুনিয়া গ্রামের খামারি সুরজিৎ ঘোষ জানান, তার পরিবার দুই দশকের বেশি সময় ধরে এই ব্যবসার সঙ্গে জড়িত।
তিনি বলেন, এই ব্যবসার জন্য আমরা প্রায় ১৫ লাখ রুপি ঋণ নিয়েছি। যেসব গরু দুধ দেওয়া বন্ধ করে দেয়, সেগুলোকে ছয়-সাত মাস ভালোভাবে খাইয়ে ঈদের হাটের জন্য প্রস্তুত করা হয়। বিক্রির পর আমরা ঋণ শোধ করি। এখন ভয়ে কেউ গরু কিনতে আসছে না। সরকারের উচিত আমাদের জন্য বিকল্প জীবিকার ব্যবস্থা করা।
একই গ্রামের আরেক খামারি সঞ্জিত ঘোষ বলেন, ঈদের আগে বিক্রির জন্য তার ২০টির মত গরু প্রস্তুত ছিল। কিন্তু ক্রেতারা ভয়ে পিছিয়ে যাওয়ায় ছয় সদস্যের পরিবার নিয়ে তিনি বিপাকে পড়েছেন। যারা অগ্রিম টাকা দিয়েছিলেন, তারা এখন টাকা ফেরত চাইছেন। ধান কেনার মত এ বছর সরকারের উচিত ন্যূনতম সহায়ক মূল্যে খামারিদের কাছ থেকে এসব পশু কিনে নেওয়া।
বাঙালি বিভিন্ন অনগ্রসর শ্রেণির মধ্যে ঘোষ পদবি ঐতিহ্যগতভাবে গোয়ালা ও সদগোপ সম্প্রদায়ের সঙ্গে যুক্ত, যাদের জীবিকা দুগ্ধ খামার ও গবাদিপশু পালনের ওপর নির্ভরশীল। সরকারের সিদ্ধান্তে এরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, কারণ গরু ব্যবসা তাদের গ্রামীণ আয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস। ব্যবসায়ীরা বলছেন, বয়স, আকার ও শারীরিক অবস্থার ওপর ভিত্তি করে ঈদের বাজারের জন্য প্রস্তুত করা প্রতিটি গরু ২ লাখ থেকে ৫ লাখ রুপিতে বিক্রি হতে পারে।
বিরোধী দলের নেতারা বলেছেন, বিজেপি সরকারের ‘গোরক্ষা’ নীতি বাংলার কৃষিভিত্তিক বাস্তবতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ভাঙড়ের ইন্ডিয়ান সেক্যুলার ফ্রন্টের (আইএসএফ) বিধায়ক নওশাদ সিদ্দিকী বলেন, শুভেন্দু অধিকারীর বিজেপি সরকার মুসলমানদের নিশানা করতে চেয়েছিল, কিন্তু তাতে উল্টো হিন্দুরাই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
গত সপ্তাহে হিঙ্গলগঞ্জে গবাদি পশুবোঝাই একটি গাড়ি আটকে বিজেপির নবনির্বাচিত বিধায়ক রেখা পাত্র জবাইয়ের যোগ্যতা প্রমাণে গরুর জন্ম সনদ বা বার্থ সার্টিফিকেট দাবি করলে বিতর্ক আরও জোরালো হয়। রেখা পাত্র বলেন, আমাদের সরকার নির্দেশ দিয়েছে, ১৪ বছরের কম বয়সী গরু জবাইয়ের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা থাকবে। কেউ অবৈধভাবে গরু পরিবহন করলে তাকে আটকাতে হবে এবং গরুর জন্মসনদ দেখতে হবে।
ওই ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়লে ঈদের আগে পশু ব্যবসায়ী ও খামারিদের মধ্যে আতঙ্ক আরও বাড়ে।
প্রবীণ কংগ্রেস নেতা অধীর রঞ্জন চৌধুরী মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীকে লেখা এক চিঠিতে বলেছেন, পশু জবাই নিয়ে সরকারের নির্দেশনায় মুর্শিদাবাদের মতো সংখ্যালঘু অধ্যুষিত জেলাগুলোতে ‘বিভ্রান্তি, ক্ষোভ এবং উদ্বেগ’ তৈরি হয়েছে।
রাজ্য কংগ্রেসের ভাষ্য, এটি সংখ্যালঘুদের ধর্মীয় চর্চায় ‘হস্তক্ষেপ’, যা বাংলার ‘সামাজিক সম্প্রীতি ও শান্তি’ বিনষ্ট করতে পারে।
এসইউসিআই (কমিউনিস্ট) সাধারণ সম্পাদক প্রভাস ঘোষ এক বিবৃতিতে বলেন, এই বিধিনিষেধ প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা ধর্মীয় রীতিনীতিকে কার্যত বন্ধ করে দেবে এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিতে আঘাত হানবে।
এদিকে মুসলিম আলেম ও ধর্মীয় নেতারা ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের আইনি বাধ্যবাধকতা মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছেন। প্রয়োজনে কোরবানির জন্য গরুর বদলে ছাগল বা ভেড়া বেছে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
Leave a Reply