নিজস্ব প্রতিবেদক :::সিলেটের বিভিন্ন এলাকায় বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) সেচ, সার ও বীজ কার্যক্রম পরিদর্শন করেছেন প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান ও অতিরিক্ত সচিব মো. আজিজুল ইসলাম। গত ৬ থেকে ৮ আগস্ট পর্যন্ত ধারাবাহিক পরিদর্শনে তিনি কৃষকদের সঙ্গে মতবিনিময় করে তাঁদের বিভিন্ন দাবি ও সমস্যার কথা শোনেন। এ সময় কৃষি উৎপাদন বাড়াতে আধুনিক সেচপ্রযুক্তির ব্যবহার, সার-বীজের নির্বিঘ্ন বিতরণ এবং মাঠপর্যায়ে কার্যক্রম আরও জোরদারের নির্দেশ দেন।
৭ আগস্ট জৈন্তাপুর উপজেলার চারিকাটা ইউনিয়নের সরুখেল, ভিত্তিখেল ও নয়াখেল মৌজায় জাফরাং খাল পরিদর্শন করেন বিএডিসি চেয়ারম্যান। ‘সিলেট বিভাগে ভূ-উপরিস্থ পানি ব্যবস্থাপনা ও ব্যবহারের মাধ্যমে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি’ প্রকল্পের আওতায় ৬ দশমিক ১০০ কিলোমিটার দীর্ঘ খালটি পুনঃখনন করা হয়েছে। খালটি পুনঃখননের ফলে দুই পাশে প্রায় ২০০ হেক্টর জমি নতুন করে সেচের আওতায় আসবে। এতে প্রায় ৪ হাজার ৫০০ কৃষক সরাসরি উপকৃত হবেন এবং অতিরিক্ত প্রায় ৬০০ মেট্রিক টন ফসল উৎপাদনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
পরিদর্শনকালে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও কৃষকেরা জানান, খালটি পুনঃখননের ফলে শুষ্ক মৌসুমে বোরো ধানের জমিতে সেচ দেওয়া সহজ হবে। একই সঙ্গে আগাম বন্যার পানি দ্রুত নিষ্কাশন হওয়ায় ফসলি জমি রক্ষায়ও এটি ভূমিকা রাখবে। কৃষকেরা খালের শেষ প্রান্তে একটি ওয়াটার রিটেনশন স্ট্রাকচার নির্মাণের দাবি জানান। তাঁদের দাবির যৌক্তিকতা বিবেচনা করে সমীক্ষা যাচাই করে এটি বাস্তবায়নের জন্য প্রকল্প পরিচালককে নির্দেশ দেন বিএডিসি চেয়ারম্যান।
এর আগে ৬ আগস্ট কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার দক্ষিণ রনিখাই ইউনিয়নের গৌরিনগর মৌজায় গৌরিনগর গণকূপ সেচ স্কিম পরিদর্শন করেন তিনি। এ সময় কৃষকেরা সেচনালা আরও ৫০০ মিটার সম্প্রসারণ এবং সেচের অভাবে অনাবাদি থাকা জমির জন্য নতুন একটি গভীর নলকূপ স্থাপনের দাবি জানান।
বিএডিসি চেয়ারম্যান জানান, বিদ্যুৎচালিত গণকূপ সেচ স্কিমগুলো দ্রুত সৌরশক্তিচালিত ব্যবস্থায় রূপান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হবে। এতে দিনে সৌরশক্তি এবং রাতে বিদ্যুৎ ব্যবহার করে সেচ স্কিম পরিচালনা করা সম্ভব হবে। ফলে বিদ্যুতের অপচয় কমার পাশাপাশি কৃষি উৎপাদন বাড়বে। কৃষকদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে নতুন একটি গণকূপ সেচ স্কিম স্থাপন এবং গৌরিনগর সেচ স্কিমে আরও ৫০০ মিটার ভূগর্ভস্থ সেচনালা সম্প্রসারণের জন্য প্রকল্প পরিচালককে নির্দেশ দেন তিনি।
৭ আগস্ট সিলেট অঞ্চলের টিএফজি সার সংরক্ষণাগারও পরিদর্শন করেন বিএডিসি চেয়ারম্যান। এ সময় তিনি সিলেট অঞ্চলে সারের মজুদ ও সরবরাহ পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত হন। ডিলাররা গুদাম থেকে সার উত্তোলনের পর তাঁদের নিজস্ব গুদামে সঠিকভাবে মজুদ করছেন কি না, তা নিয়মিত মনিটরিংয়ের ওপর গুরুত্ব দেন। পাশাপাশি গুদামের দরজা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় মেরামতের ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেন। লাউয়াই পিএফজি ও সুনামগঞ্জ সার গুদামের গুদামরক্ষকদের প্রয়োজনীয়তা এবং আনসার সদস্যদের আবাসনসহ সার্বিক কার্যক্রম নিয়েও মতামত দেন তিনি।
৮ আগস্ট বিএডিসির সিলেট বীজ উৎপাদন কেন্দ্র পরিদর্শন করেন মো. আজিজুল ইসলাম। এ সময় বীজ গুদামের মজুদ পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত হন এবং বিআর-১৪ জাতের মানঘোষিত শ্রেণির বীজ উৎপাদনের প্রেক্ষাপট সম্পর্কে জানতে চান।
৭ আগস্ট সিলেট সদর বীজ উৎপাদন খামার পরিদর্শনকালে একটি নিমগাছের চারা রোপণ করেন বিএডিসি চেয়ারম্যান। পরে খামারে আবাদ করা আমন ধানের বিভিন্ন জাত সম্পর্কে খোঁজখবর নেন। ভিত্তিবীজের উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণ বাড়াতে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেন। খামারের সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ, দৃষ্টিনন্দন মূল ফটক স্থাপন এবং ফটক থেকে খামারে প্রবেশের ভাঙা সড়ক পুনর্নির্মাণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
এ সময় খামারে মাত্র তিনজন জনবল কর্মরত থাকার বিষয়টি অবহিত হয়ে প্রয়োজনীয় জনবলের বিষয়ে গুরুত্ব দেন চেয়ারম্যান। পাশাপাশি খামারের সার্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি সম্পর্কেও খোঁজখবর নেন।
৮ আগস্ট বিএডিসি সিলেটের সব কর্মকর্তা-কর্মচারীর সঙ্গে মতবিনিময় করেন চেয়ারম্যান মো. আজিজুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘সিলেট বিভাগে ভূ-উপরিস্থ পানি ব্যবস্থাপনা ও ব্যবহারের মাধ্যমে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি’ প্রকল্পের কার্যক্রম স্থানীয় কৃষকদের চাহিদা ও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার আলোকে সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বাস্তবায়ন করতে হবে। ডিপিপিতে অন্তর্ভুক্ত নয়, কিন্তু স্থানীয়ভাবে প্রয়োজনীয় এমন কাজ বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনে ডিপিপি পুনর্গঠনের ব্যবস্থা নিতে হবে।
তিনি কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধিতে আধুনিক সেচপ্রযুক্তির ব্যবহার এবং কৃষকদের কাছে সার ও বীজের নির্বিঘ্ন সরবরাহ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন। মাঠপর্যায়ে কর্মরত জনবলের সুষ্ঠু পদায়ন, নিয়োগ ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে স্বচ্ছ প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। একই সঙ্গে বিএডিসির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সততা, নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানান।
পরিদর্শন ও মতবিনিময়ের সময় বিএডিসির সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের কর্মকর্তা, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, কৃষক এবং বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
Leave a Reply