পারভেজ আহমদ :::২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের মতো সিলেটও ছিল উত্তপ্ত। পুরো জুলাইজুড়ে নগরী ও জেলার বিভিন্ন এলাকায় সংঘর্ষ, ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া, গুলিবর্ষণ এবং সহিংসতার ঘটনায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। একদিকে পুলিশ ও তৎকালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এবং তাদের অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মী, অন্যদিকে আন্দোলনরত ছাত্র-জনতা এমন মুখোমুখি অবস্থানে প্রতিদিনই উত্তেজনা বিরাজ করছিল।
আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়ে পুলিশের পাশাপাশি প্রকাশ্যে আগ্নেয়াস্ত্র হাতে দেখা যায় আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ ও সহযোগী সংগঠনের একাধিক ক্যাডারকে। প্রকাশ্যে অস্ত্র উঁচিয়ে গুলি ছোড়া, আন্দোলনকারীদের ধাওয়া এবং জনমনে ভয়-ভীতি সৃষ্টির অসংখ্য ছবি ও ভিডিও সে সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দুপুরে শেখ হাসিনা দেশত্যাগ করলে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে। সরকারের পতনের পরপরই প্রকাশ্যে অস্ত্র হাতে ঘুরে বেড়ানো সেই ক্যাডারদের অধিকাংশই আত্মগোপনে চলে যায়। অনেকেই সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে পালিয়ে যান বলে একাধিক সূত্র জানিয়েছে। পরবর্তীতে তাদের মধ্যে কয়েকজন অন্য দেশেও চলে গেছেন বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।
অন্যদিকে একই দিনে সিলেটের বিভিন্ন থানা ও পুলিশ ফাঁড়িতে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় বিপুল পরিমাণ সরকারি অস্ত্র ও গোলাবারুদ লুট হয়। দুই বছর পার হলেও সেই অস্ত্রের সবগুলো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। একই সঙ্গে আন্দোলনের সময় প্রকাশ্যে প্রদর্শিত অবৈধ অস্ত্রগুলোরও বড় অংশ এখনো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নাগালের বাইরে রয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে জনমনে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সচেতন নাগরিকদের প্রশ্ন যে অস্ত্র দিয়ে প্রকাশ্যে গুলি চালানো হয়েছিল, সেই অস্ত্রগুলো এখন কোথায়? কার কাছে রয়েছে? এগুলো আবার কোনো অপরাধে ব্যবহৃত হবে না তো?
আখালিয়া থেকে কোর্ট পয়েন্ট অস্ত্রের মহড়া
বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সময় সিলেটে একাধিক ঘটনায় প্রকাশ্যে আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার দেখা যায়।
২০২৪ সালের ১৮ জুলাই নগরীর আখালিয়া এলাকায় পুলিশের সঙ্গে একযোগে আন্দোলনরত ছাত্র-জনতার ওপর হামলা চালায় ছাত্রলীগের ক্যাডাররা। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, সেখানে আগ্নেয়াস্ত্র প্রদর্শন করে আতঙ্ক সৃষ্টি করা হয়।
এরপর শেখ হাসিনা সরকারের পতনের আগের দিন, অর্থাৎ ৪ আগস্ট, সিলেট নগরীর কেন্দ্রীয় কোর্ট পয়েন্ট এলাকায় ছাত্র-জনতার পূর্বঘোষিত সমাবেশকে কেন্দ্র করে আরও ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। আওয়ামী লীগ ও তাদের অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের অন্তত ৩০ জন সশস্ত্র ক্যাডার অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে সেখানে অবস্থান নেয়। প্রকাশ্যে অস্ত্র উঁচিয়ে গুলি ছোড়া ও ত্রাস সৃষ্টি করার অভিযোগ ওঠে তাদের বিরুদ্ধে।
পরে ওই সশস্ত্র ক্যাডাররা জিন্দাবাজার, আম্বরখানা, নয়াসড়কসহ নগরীর বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে অস্ত্রের মহড়া দেয়। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং ব্যবসা প্রতিষ্ঠানসহ অনেক কিছুই বন্ধ হয়ে যায়।
এসএমপির ১৬টি অস্ত্র এখনো উদ্ধার হয়নি
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের (এসএমপি) বিভিন্ন থানা ও পুলিশ ফাঁড়ি থেকে মোট ১০১টি আগ্নেয়াস্ত্র লুট হয়েছিল।
এর মধ্যে ৮৫টি অস্ত্র উদ্ধার করা হলেও এখনো ১৬টি অস্ত্র উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
এসএমপির উপ-পুলিশ কমিশনার (মিডিয়া) মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম জানান, আন্দোলনের সময় প্রদর্শিত অবৈধ অস্ত্র এবং পুলিশের লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। অস্ত্রধারীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে পুলিশ নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে।
জেলা পুলিশের ১০টি অস্ত্রও নিখোঁজ
সিলেট জেলা পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, জেলার বিভিন্ন থানা থেকে ৩১টি অস্ত্র লুট হয়েছিল।
এর মধ্যে ২১টি অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। তবে এখনো ১০টি অস্ত্র উদ্ধার হয়নি।
সিলেট জেলা পুলিশ সুপার ড. চৌধুরী মো. যাবের সাদেক বলেন, লুণ্ঠিত অস্ত্র উদ্ধারে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। পাশাপাশি গোয়েন্দা তৎপরতা জোরদার করা হয়েছে এবং পলাতক অস্ত্রধারীদের শনাক্ত করেও অভিযান চালানো হচ্ছে।
র্যাবের অভিযানও চলমান
র্যাব-৯-এর অধিনায়ক উইং কমান্ডার তাজমিনুর রহমান চৌধুরী বলেন, অবৈধ অস্ত্র এবং পুলিশের লুণ্ঠিত অস্ত্র উদ্ধারে র্যাব নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে।
তিনি জানান, বিভিন্ন অভিযানে র্যাব পুলিশের লুণ্ঠিত একাধিক আগ্নেয়াস্ত্র, বিপুল পরিমাণ গুলি, সাউন্ড গ্রেনেড, টিয়ারশেল এবং টিয়ারশেল গ্রেনেড উদ্ধার করেছে। অবৈধ অস্ত্রধারীদের শনাক্ত এবং পলাতকদের আইনের আওতায় আনতে গোয়েন্দা নজরদারি ও অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
জনমনে বাড়ছে উদ্বেগ
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, কোনো সহিংস ঘটনার পর অবৈধ অস্ত্র দীর্ঘ সময় উদ্ধার না হওয়া আইনশৃঙ্খলার জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করে। এসব অস্ত্র পরবর্তীতে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, ডাকাতি কিংবা রাজনৈতিক সহিংসতায় ব্যবহারের আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
দুই বছর পেরিয়ে গেলেও আন্দোলনের সময় প্রকাশ্যে প্রদর্শিত অবৈধ অস্ত্রের বড় অংশ এবং পুলিশ থেকে লুট হওয়া সব অস্ত্র উদ্ধার না হওয়ায় সিলেটবাসীর মধ্যে উদ্বেগ এখনো কাটেনি। সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, দ্রুত সব অস্ত্র উদ্ধার এবং অস্ত্রধারীদের গ্রেপ্তার করা গেলে জনমনে স্বস্তি ফিরবে এবং ভবিষ্যতে এমন সহিংসতার পুনরাবৃত্তি রোধে কার্যকর বার্তা যাবে।
Leave a Reply