সিলেটের চা শ্রমিক এবং খাসিয়া ও গারো জনগোষ্ঠীর নারী ও কিশোরীদের যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্যের নাজুক পরিস্থিতি ও নানাবিধ সামাজিক কুসংস্কারের চিত্র উঠে এসেছে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবিপ্রবি) এক গবেষণায়।
বিশ্বব্যাংক ও ইউজিসি অর্থায়নে পরিচালিত হিট উপ-প্রকল্পের অধীনে শাবিপ্রবির শিক্ষকদের পরিচালিত এই গবেষণার ফলাফল শনিবার বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান ভবনের ৪০২ নম্বর কক্ষে প্রাথমিকভাবে উপস্থাপন করা হয়।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন গবেষক দলের তত্বাবধায়ক এবং চা শ্রমিক ও নৃগোষ্ঠীর সদস্যরা।
গবেষণায় দেখা গেছে, আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থার এই যুগেও প্রান্তিক এই জনগোষ্ঠীগুলোর মাঝে প্রজনন স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতনতার চরম অভাব এবং গভীর সামাজিক ও ধর্মীয় কুসংস্কার বিদ্যমান।
গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, এই জনগোষ্ঠীর নারী ও কিশোরীদের মাঝে মাসিক বা পিরিয়ডকালীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিয়ে উদাসীনতা লক্ষ্য করা গেছে। লোকলজ্জার ভয়ে তারা পিরিয়ড সংক্রান্ত অসুস্থতায় চিকিৎসকের কাছে যেতে চান না। এমনকি মাসিকের সময় প্যাডের পরিবর্তে কাপড় ব্যবহার করলেও তা লোকচক্ষুর আড়ালে রাখতে অন্ধকার ও স্যাঁতস্যাঁতে ঘরে শুকিয়ে পুনরায় ব্যবহার করেন। এতে তাদের স্বাস্থ্য ঝুঁকি চরমভাবে বাড়ছে। এছাড়া মাসিকের সময় সৃষ্ট শারীরিক বিভিন্ন জটিলতাকে তারা সাধারণ সমস্যা হিসেবে গণ্য করেন, ফলে বড় ধরনের অসুস্থতাতেও তারা চিকিৎসার প্রয়োজন বোধ করেন না।
পরিবার পরিকল্পনা ও সন্তান প্রসবের ক্ষেত্রেও নারীদের নিজস্ব সিদ্ধান্তের অভাব এই গবেষণায় স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। অল্প বয়সে বিয়ের পর সন্তান নেওয়ার ক্ষেত্রে স্বামী এবং বিশেষ করে শাশুড়ির মতামতকেই প্রধান্য দেওয়া হয়। অনেক ক্ষেত্রে দ্রুত সন্তান ধারণের জন্য শাশুড়ির পক্ষ থেকে প্রচণ্ড চাপ দেওয়া হয় এবং জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি গ্রহণেও বাধা প্রদান করা হয়। এছাড়া হাসপাতাল ও সিজারিয়ান অপারেশন নিয়ে এক ধরনের অমূলক ভীতি কাজ করে এই জনগোষ্ঠীগুলোর মাঝে। তারা মনে করেন, হাসপাতালে গেলেই চিকিৎসকরা সিজার করবেন। এই ভীতি থেকে তারা বাড়িতেই ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে সন্তান প্রসব করেন এবং প্রসব-পরবর্তী সময়েও কোনো অভিজ্ঞ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন না।
গবেষণা ফলাফল উপস্থাপন অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, প্রান্তিক এই জনগোষ্ঠীর মাঝে প্রচলিত ধর্মীয় ও সামাজিক কুসংস্কার দূর করতে না পারলে তাদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। বিশেষ করে চা শ্রমিক ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর নারীদের স্বাস্থ্যমান উন্নয়নে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে সচেতনতামূলক কার্যক্রম আরও বৃদ্ধির ওপর জোর দেন গবেষকরা।
এটি হিট প্রজেক্টের অধীনে ‘সিলেটের খাসিয়া, গারো এবং চা শ্রমিক সম্প্রদায়ের নারী ও কিশোরীদের যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য উন্নয়ন’ বিষয়ক প্রকল্প।
জানা যায়, গবেষণাটি বিশ্বব্যাংক ও ইউজিসি অর্থায়নে পরিচালিত হিট উপ-প্রকল্প। উপ-প্রকল্পের ব্যবস্থাপক হিসেবে রয়েছেন সমাজকর্ম বিভাগের অধ্যাপক ড. ফয়সাল আহমেদ, সহকারী উপ-প্রকল্প ব্যবস্থাপক একই বিভাগের অধ্যাপক ড. ইসমাইল হোসেন ও সদস্য লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ শাহজাহান চৌধুরী। এ ছাড়াও গবেষণা সহকারী দলে রয়েছেন সমাজকর্ম বিভাগের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী মার্জিয়া সুলতানা পিংকি, আতিয়া শারমিন, রুবেল মিয়া, মরিয়ম আঞ্জুম জেরিন ও লোকপ্রশাসন বিভাগের ময়ূরী দেবনাথ এবং ঝুমা খানম স্মৃতি।
Leave a Reply