হবিগঞ্জে টানা বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে জেলার হাওরাঞ্চলে ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। অব্যাহত জলাবদ্ধতায় ইতোমধ্যে প্রায় সাড়ে ১১ হাজার হেক্টর বোরো ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে। এতে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৪০ কোটি টাকা বলে জানিয়েছে জেলা কৃষি বিভাগ।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন হাওরপাড়ের কৃষক ও বর্গাচাষীরা। অনেকেই পানির নিচ থেকে কষ্ট করে পচা, আধা পচা ও চারা গজানো ধান তুলে এনে রোদের মধ্যে শুকিয়ে কোনোমতে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছেন। দিনের বেলায় সামান্য রোদ উঠলেও রাতভর আবার বৃষ্টি হওয়ায় হাওরের পানির উচ্চতায় তেমন পরিবর্তন হচ্ছে না। ফলে কৃষকদের দুশ্চিন্তা আরও বাড়ছে।
জেলার বানিয়াচং, আজমিরীগঞ্জ, বাহুবল, লাখাই ও নবীগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন হাওর ঘুরে দেখা গেছে, কৃষক-কৃষাণীরা ভেজা ধান ঘরের উঠান, রাস্তার পাশে ও খোলা মাঠে বিছিয়ে শুকানোর কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন। অনেক ধানে ইতোমধ্যে পচন ধরেছে, আবার কিছু ধানে চারা গজিয়ে গেছে। এসব ধান বাজারজাত করা কঠিন হলেও অন্তত গবাদিপশুর খাদ্য বা নিম্নমানের চাল হিসেবে ব্যবহার করা যাবে— এই আশায় কৃষকেরা শেষ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
বামিয়াচং উপজেলার সুবিদপুর এলাকার এক কৃষাণী পবিত্র রাণী দাস বলেন, ধারদেনা করে ৮ বিঘা জমিতে বোরো আবাদ করেছিলাম। ধান কাটার আগেই হাওরের পানি সব শেষ করে দিল। এখন পচা ধান শুকিয়ে অন্তত কিছু টাকা ফেরত পাওয়ার চেষ্টা করছি।
একই উপজেলার বর্গাচাষী নুরুল ইসলাম বলেন, ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছি, আবার এনজিওর কিস্তিও আছে। ফসল না থাকলে কীভাবে ঋণ শোধ করব বুঝতে পারছি না। এখন পরিবার নিয়ে খুব কষ্টে আছি।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে জেলায় প্রায় ১ লাখ ২৩ হাজার ৬৬ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছিল। এর মধ্যে আকস্মিক বন্যা ও অতিবৃষ্টিতে সাড়ে ১১ হাজার হেক্টরের বেশি জমির ধান সম্পূর্ণ বা আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষতির পরিমাণ প্রাথমিকভাবে প্রায় ৩৪০ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের অতিরিক্ত উপপরিচালক দীপক কুমার পাল জানান, আমরা ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার তালিকা প্রস্তুত করছি। ইতোমধ্যে ২১ হাজার ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের তালিকা তৈরি করা হয়েছে। কৃষকদের সহায়তায় সরকারের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে। এছাড়া ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য প্রণোদনার বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে।
এদিকে হাওরাঞ্চলের অনেক পরিবার এখন খাদ্য ও আর্থিক সংকটের মুখে পড়েছে। কৃষকদের অভিযোগ, সময়মতো বাঁধ মেরামত ও পানি নিয়ন্ত্রণের কার্যকর ব্যবস্থা না থাকায় প্রতি বছরই তাদের এমন ক্ষতির মুখে পড়তে হয়। তারা দ্রুত ক্ষতিপূরণ, সহজ শর্তে ঋণ পুনঃতফসিল এবং কৃষি প্রণোদনার দাবি জানিয়েছেন।
Leave a Reply