পারভেজ আহমদ :::সিলেট নগরীর রায়নগরে একই বাসায় স্বামী-স্ত্রী ও এক গৃহপরিচারিকাকে হত্যার ঘটনায় প্রধান সন্দেহভাজন বাবুল মিয়া (৪০)কে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। পুলিশের দাবি, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে বাবুল একাই তিনজনকে হত্যার কথা স্বীকার করেছেন। মাত্র ১০ মিনিটের মধ্যে একে একে তিনজনকে হত্যা করে পালিয়ে যাওয়ার চাঞ্চল্যকর তথ্যও দিয়েছে সে।
বুধবার (১২ আগস্ট) বিকেলে ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফিংয়ে এসব তথ্য জানান সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের (এসএমপি) কমিশনার সারোয়ার মুর্শেদ শামীম।
পুলিশ কমিশনার জানান, প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং ঘটনাস্থলের পারিপার্শ্বিক তথ্য বিশ্লেষণ করে পুলিশের বিশেষ টিম অভিযান চালিয়ে বিকেল ৩টার দিকে বাবুল মিয়াকে রায়নগর এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বুধবার সকাল ৯টা ২৫ মিনিট থেকে ৯টা ৩৫ মিনিটের মধ্যে মাত্র ১০ মিনিটে তিনজনকে হত্যা করা হয়।
প্রেমের সম্পর্কের সূত্র ধরে বাসায় প্রবেশ
পুলিশের প্রাথমিক তদন্ত অনুযায়ী, নিহত গৃহপরিচারিকা তাহমিনার সঙ্গে প্রায় ১৫ থেকে ২০ দিন আগে বাবুলের প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। বাবুল পেশায় কসাই। পাশাপাশি মাঝেমধ্যে রংমিস্ত্রির কাজও করতেন। ওই বাসায় আগে কাজ করার সুবাদে বাসার মালিক ও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে তার পরিচয় ছিল।
পুলিশের ভাষ্য, বুধবার সকালে বাবুল ওই বাসায় গিয়ে দরজায় নক করেন। গৃহপরিচারিকা তাহমিনা দরজা খুলে তাকে ভেতরে নিয়ে যান। এরপর একটি কক্ষে দুজনের মধ্যে কথাকাটাকাটি শুরু হয়। একপর্যায়ে বাবুল সঙ্গে থাকা ছুরি দিয়ে তাহমিনাকে আঘাত করেন বলে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছে পুলিশ।
চিৎকার শুনে এগিয়ে এসে হামলার শিকার গৃহকর্ত্রী
তাহমিনার চিৎকার শুনে গৃহকর্ত্রী সুরাইয়া বেগম এগিয়ে এলে তাকেও ছুরিকাঘাত করা হয় বলে জানিয়েছে পুলিশ। পরিস্থিতি বুঝতে পেরে গৃহকর্তা আব্দুস সাত্তার বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেন।
এ সময় বাবুলের সঙ্গে তাঁর ধস্তাধস্তি হয়। একপর্যায়ে আব্দুস সাত্তারকেও কুপিয়ে হত্যা করা হয় বলে পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে।
অর্থাৎ, পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, মাত্র কয়েক মিনিটের ব্যবধানে একই বাসার ভেতরেই প্রাণ হারান গৃহপরিচারিকা তাহমিনা, গৃহকর্ত্রী সুরাইয়া বেগম এবং গৃহকর্তা আব্দুস সাত্তার।
বারান্দা দিয়ে পালিয়ে যায় বাবুল
তিনজনকে হত্যার পর বাবুল বাসার বারান্দা দিয়ে নিচে নেমে পালিয়ে যায় বলে জানিয়েছেন পুলিশ কমিশনার। পরে প্রযুক্তির সহায়তায় তার অবস্থান শনাক্ত করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় রায়নগর এলাকা থেকেই তাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশের বিশেষ দল।
পুলিশ বলছে, হত্যাকাণ্ডের পর দ্রুত এলাকা ছেড়ে পালানোর চেষ্টা করলেও প্রযুক্তিগত নজরদারির কারণে বাবুলকে বেশিক্ষণ আত্মগোপনে থাকতে পারেনি।
হত্যার অস্ত্র উদ্ধারে অভিযান
সিলেট কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খান মুহাম্মদ মাইনুল জাকির জানান, বাবুলের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত অস্ত্র উদ্ধারে অভিযান চলছে।
মিতালী ১১১ নম্বর বাসার পাশের ঝোপঝাড়ে পুলিশ সদস্যরা তল্লাশি চালাচ্ছেন। হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত অস্ত্র উদ্ধার করা গেলে তদন্তে আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যাবে বলে মনে করছে পুলিশ।
মরদেহ মর্গে, মামলা দায়েরের প্রস্তুতি
হত্যাকাণ্ডে নিহত তিনজনের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। এ ঘটনায় কোতোয়ালি মডেল থানায় মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে।
তবে পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে বাবুল একাই হত্যাকাণ্ডের কথা স্বীকার করলেও ঘটনার সঙ্গে আর কেউ জড়িত ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। হত্যার প্রকৃত কারণ, পূর্বপরিকল্পনা ছিল কি না এবং ঘটনার পেছনে অন্য কোনো বিষয় রয়েছে কি না এসব বিষয়ও তদন্তের আওতায় রয়েছে।
রায়নগরের একই বাসায় একসঙ্গে তিনজনের হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় এলাকায় চরম আতঙ্ক ও শোকের সৃষ্টি হয়েছে। ঘটনার রহস্য উদঘাটনে পুলিশের তদন্ত এখন আরও গভীরভাবে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
Leave a Reply