দিপু সিদ্দিকী:::ওমরাহ করতে গিয়ে বার বার মাতাফে প্রথম যে অনুভূতিটা আমাকে আচ্ছন্ন করে, তা হলো বিস্ময়। চোখের সামনে শুধু মানুষ আর মানুষ। সাদা ইহরামের ঢেউ, চারদিক কানায় কানায় ভরা। মনে হচ্ছিল, এত ভিড়ে কীভাবে তাওয়াফ করব? কোথায় পা ফেলব? এই প্রশ্নগুলো মাথায় ঘুরছিল তাওয়াফ শুরুর আগমুহূর্ত পর্যন্ত।
কিন্তু বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবর বলে কাবার দিকে মুখ করে প্রথম কদম রাখার পরই দৃশ্যটা বদলে যেতে শুরু করল। ভিড় ছিল, মানুষ ছিল, কিন্তু আশ্চর্যভাবে প্রতি কদমেই প্রয়োজনমতো জায়গা পাওয়া যাচ্ছিল। কেউ ধাক্কা দিচ্ছে না, কেউ গায়ে পড়ে যাচ্ছে না। কাঁধে কাঁধ লেগেছে, তবু অস্বস্তি নেই। মনে হচ্ছিল, অদৃশ্য কোনো ব্যবস্থাপনায় আল্লাহ নিজেই পথ খুলে দিচ্ছেন।
এই অভিজ্ঞতা আমাকে বারবার একটি আয়াতের কথা মনে করিয়ে দিয়েছে- “আর যে আল্লাহর উপর ভরসা করে, আল্লাহ তার জন্য যথেষ্ট।”
(সূরা আত-তালাক, আয়াত ৩)
মাতাফে সেই আয়াত যেন চোখের সামনে জীবন্ত হয়ে উঠেছিল। এখানে কোনো স্বেচ্ছাসেবক জায়গা করে দিচ্ছে না, কোনো নির্দেশনা কাজ করছে না। হাজারো মানুষের ভিড়েও আল্লাহ প্রত্যেক বান্দার জন্য আলাদা আলাদা পথ তৈরি করে দিচ্ছেন। এটা মানুষের শক্তি নয়, এটা কেবল রবের কুদরত।
তাওয়াফ যত এগোচ্ছিল, ভিড়ের ভয় তত মিলিয়ে যাচ্ছিল। মনে হচ্ছিল, আমি আর এই ভিড়ের অংশ নই। আমি একা, আর আমার সামনে শুধু কাবা, আর ওপরে আমার রব। এই অনুভূতিই বুঝিয়ে দেয়, তাওয়াফ শুধু শারীরিক ঘোরাফেরা নয়; এটা আত্মার সফর। এখানে মানুষ মানুষের মাঝে থেকেও একান্তভাবে আল্লাহর সঙ্গে থাকে।
রাসূল (সা.) বলেছেন, “এই ঘরের চারদিকে তাওয়াফ, সাফা-মারওয়ার মাঝে সাঈ এবং জামারাতে পাথর নিক্ষেপ নির্ধারিত হয়েছে আল্লাহর স্মরণ কায়েম করার জন্য।”
(সুনান তিরমিজি)
মাতাফে দাঁড়িয়ে আমি বুঝেছি, আল্লাহর স্মরণ কেবল জিকিরে সীমাবদ্ধ নয়। আল্লাহর স্মরণ মানে তাঁর উপর সম্পূর্ণ ভরসা। ভিড়ের মাঝেও যে প্রশান্তি, যে নিরাপত্তা- তা সেই ভরসারই ফল।
একসময় মনে হলো, এই ভিড় আসলে ভিড় নয়। এটা আল্লাহর দরবারে উপস্থিত বান্দাদের সমবেত হওয়া। এখানে কেউ অপরিচিত নয়, কেউ অপ্রয়োজনীয় নয়। সবাই আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের ডাকা অতিথি। তাই কেউ কাউকে কষ্ট দেয় না, কেউ কাউকে ঠেলে ফেলে না। আল্লাহ নিজেই সবাইকে ধারণ করেন।
তাওয়াফ শেষ করে যখন পেছনে তাকালাম, তখনও দেখলাম সেই একই ভিড়। কিন্তু ভেতরের ভয়টা আর নেই। তখন বুঝলাম, আল্লাহ যদি চান, সবচেয়ে সংকীর্ণ জায়গাও প্রশস্ত হয়ে যায়। আর যদি তিনি না চান, প্রশস্ত জায়গাও সংকীর্ণ হয়ে ওঠে।
মাতাফ আমাকে নতুন করে শিখিয়েছে- জীবনের ভিড়েও যদি আল্লাহর উপর ভরসা রাখা যায়, তবে প্রতি কদমেই পথ খুলে যায়। মানুষে মানুষে ধাক্কা লাগে না, আর হৃদয়ে কোনো চাপও থাকে না।
আল্লাহ তায়ালার অপার রহমতে যতবারই মাতাফে তাওয়াফ করেছি, প্রচন্ড ভিড় থাকা স্বত্তেও মাতাফে তাওয়াফ করতে একই অনুভূতি ফিরে এসেছে। আমাদের রব, কিভাবে জনারণ্যেও প্রত্যেককে আলাদা আলাদা প্রশস্ততা দিচ্ছেন।
নোট : আমার পরিচিত অনেকেই এ ধরনের প্রশস্ততা কথা নিজে অবলোকন করেছেন বলে জানিয়েছেন। আল্লাহ তায়ালা সবার হজ-ওমরাহ কবুল করুন। আমিন।
Leave a Reply