নিজস্ব প্রতিবেদক ::: সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ থানায় দায়ের হওয়া একটি আলোচিত গরু চুরির মামলার এজাহার (এফআইআর) নিয়ে লুকোচুরির অভিযোগ উঠেছে। মামলার তদন্ত সংশ্লিষ্ট তথ্য জানতে চাইলে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সুজন চন্দ্র কর্মকার আসামিদের নাম প্রকাশ করতে অস্বীকৃতি জানান। শনিবার বিকেলে তিনি বলেন, “মামলার আসামিদের নাম জানানো যাবে না। পরে একসময় জানাবো।”
সাংবাদিকের হাতে আসা মামলার প্রাথমিক তথ্য বিবরণী (এজাহার) অনুযায়ী, গত ১৭ জুলাই দায়ের হওয়া এই মামলার নম্বর ১৯, জিআর নম্বর ১৬৪/২০২৬। মামলাটি করা হয়েছে বিশেষ ক্ষমতা আইন, ১৯৭৪-এর ২৫(খ)(১)(খ) ধারায়, যা চোরাচালানের শাস্তি সংক্রান্ত বিধান।¹
এজাহারে বলা হয়েছে, কোম্পানীগঞ্জ থানাধীন ৫ নং উত্তর রনিখাই ইউনিয়নের লামাগ্রামে অবস্থিত আব্দুল হেকিমের গোয়ালঘর থেকে চোরাই গরু উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় এসআই মো. অলিউল্লাহ বাদী হয়ে ছয়জনের নাম উল্লেখ করে মামলা করেছেন।
মামলার আসামীরা হলো আব্দুল হেকিম (৫৫), মো. ইমরান হোসেন কালা ওরফে কালা ডাক্তার (৩৭), আইনুল (৩৫), আফতার উদ্দিন (৩০), মাসুদ আহমেদ (২৬) ও আমজাদ ওরফে লাইনম্যান (৩২)। এ ছাড়া অজ্ঞাতনামা আরও ৫-৬ জনকে আসামি করা হয়েছে।
অভিযোগে বলা হয়েছে, ভারতীয় গরু শুল্ক ফাঁকি দিয়ে অবৈধভাবে বাংলাদেশে এনে বিক্রির উদ্দেশ্যে নিজেদের হেফাজতে রাখা হয়েছিল। জব্দ তালিকা অনুযায়ী, বিভিন্ন রঙের ৫টি ভারতীয় গরু জব্দ করা হয়, যার আনুমানিক মূল্য প্রায় ২ লাখ ৯০ হাজার টাকা।
ঘটনার পর মামলা হলেও এজাহার নিয়ে চলতি দায়িত্বে থাকা ওসির এমন অবস্থানে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা। তাদের দাবি, কোম্পানীগঞ্জ থানায় মামলা সংক্রান্ত তথ্য গোপন করা নতুন কোনো ঘটনা নয়। অতীতেও গরু চুরি, পাথর চুরি ও সীমান্তকেন্দ্রিক বিভিন্ন আলোচিত মামলায় তথ্য গোপন, এজাহার না দেওয়া কিংবা প্রকৃত তথ্য আড়াল করার অভিযোগ বহুবার উঠেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, “মামলা নিয়ে লুকোচুরি কোম্পানীগঞ্জে নতুন কিছু নয়। এর আগেও একাধিক বিতর্কিত ওসির সময় গরু চুরি ও পাথর চুরির মামলায় একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে।
তারা আরও বলেন, মামলার তথ্য প্রকাশে স্বচ্ছতা না থাকলে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হয় এবং অসাধু চক্রের অপতৎপরতার সুযোগ সৃষ্টি হয়। সুশাসন ও স্বচ্ছতার স্বার্থে মামলার এজাহার ও তদন্ত-সংশ্লিষ্ট তথ্য আইন অনুযায়ী প্রকাশ এবং তথ্য গোপনের চেষ্টার নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন মহল।
ওসি সুজন চন্দ্র কর্মকার আসামিদের নাম প্রকাশে অস্বীকৃতি জানান এ প্রতিবেদককে। শুধু মামলা দায়ের হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেন তিনি। অথচ এ মামলার একাধিক আসামি কোম্পানীগঞ্জ ও গোয়াইনঘাট থানার একাধিক মামলার চিহ্নিত পলাতক আসামী। তারা প্রকাশ্যে চলাচল করলেও কোম্পানীগঞ্জ থানা পুলিশ তাদের আটক করে নি।
উল্লেখ্য কোম্পানীগঞ্জ থানায় অতীতে দায়িত্ব পালন করা একাধিক ওসি ও পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে পাথর চোর, গরুচোরদের সহযোগিতার অভিযোগ রয়েছে।
চোরাকারবারি, পাথর কোয়ারি থেকে অবৈধভাবে পাথর উত্তোলনকারীদের সহযোগিতা এবং চাঁদাবাজির সুনির্দিষ্ট অভিযোগে গত ৯ জুলাই কোম্পানীগঞ্জ থানার ওসি মো. শফিকুল ইসলাম খানকে তাৎক্ষণিকভাবে প্রত্যাহার করে সিলেট পুলিশ লাইন্সে সংযুক্ত করা হয়। এর আগে শফিকুল ইসলাম হজের ছুটিতে থাকাকালে সুজন চন্দ্র কর্মকার ওসির দায়িত্বে ছিলেন।
সিলেট জেলা পুলিশ সুপার ড. চৌধুরী মো. যাবের সাদেক ওসি শফিকুলকে প্রত্যাহারের পর ওইদিন জানান, তার বিরুদ্ধে অনিয়ম ও চাঁদাবাজির কিছু ভিডিও-ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে এই অ্যাকশন নেওয়া হয় এবং একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে চাঁদাবাজি ও অনিয়মের দায়ে একযোগে কোম্পানীগঞ্জ থানার ১৩ পুলিশ সদস্য ক্লোজড করা হয়। কোম্পানীগঞ্জের শাহ আরেফিন টিলা কেটে অবৈধ পাথর উত্তোলন এবং পাথরবাহী গাড়ি থেকে পুলিশের প্রকাশ্য চাঁদাবাজির ছবি ও ভিডিও ফাঁসের জেরে থানার ২ জন এসআই, ২ জন এএসআই এবং ৯ জন কনস্টেবলসহ মোট ১৩ জন পুলিশ সদস্যকে একযোগে প্রত্যাহার করে পুলিশ লাইন্সে নেওয়া হয়েছিল।
এছাড়া কোম্পানীগঞ্জ থানায় এজাহার বা মামলা নিয়ে লুকোচুরি এবং অনিয়মের কারণে ২০২০ সালেও টাকা তৎকালীন ওসি সজল কুমার কানুসহ ৪ পুলিশ সদস্যকে একইভাবে প্রত্যাহার করা হয়েছিল।
Leave a Reply