সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি :::সুনামগঞ্জ জেলার দোয়ারাবাজার সীমান্ত এলাকার তরুণদের নিয়ে উদ্বেগ উৎকণ্ঠায় পড়েছেন এলাকার অনেক অভিভাবক। পুলিশ বিজিবি ওই সীমান্ত এলাকাকে বিশেষ নজরদারির মধ্যে রাখছে। গেল ৩০ জুলাই ওই সীমান্ত এলাকার তিন তরুণের ছবি ও ভিডিও এক ভারতীয় খাসিয়া নাগরিকের সঙ্গে অস্ত্রসহ ভাইরাল হলে এই উদ্বেগ বাড়ে। ওই তরুণদের হাতে থাকা অস্ত্রের মধ্যে একটি দুনালা বন্ধুকও ছিল। এই ভিডিও প্রচারের তিনদিন পর পুলিশ এক তরুণকে গ্রেপ্তার করেছে।
পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেপ্তারকৃত যুবক অস্ত্রসহ ভাইরাল হওয়া ছবির একজনের ভাই হেলাল আহমেদ (২০)। বাংলাবাজার ইউনিয়নের জুমগাঁও খাসিয়াবাড়ি এলাকায় অভিযান চালিয়ে গেল দুই জুলাই তাকে আটক করা হয়। সে জুমগাঁও খাসিয়াবাড়ি এলাকার ইদ্রিস আলীর ছেলে। পরে আদালত তাকে জেল হাজতে পাঠান। এ ঘটনায় জড়িত কাউকে আটক করা যায় নি। পুলিশ বলেছে, ভিডিও ভাইরাল হবার পর পুলিশের ধাওয়া খেয়ে ওই তিনজন (অস্ত্র হাতে ভিডিও প্রচার হওয়া ৩ জন) ভারতীয় সীমানায় চলে গেছে, আর ফিরে নি।
স্থানীয়রা জানিয়েছেন, দোয়ারাবাজার সীমান্তের বাংলাবাজার ইউনিয়নের মৌলারপার গ্রামের ১২৩৪ থেকে ১২৩৬ নম্বর সীমান্ত পিলারের মধ্যবর্তী দীর্ঘ অংশে কাঁটাতারের বেড়া না থাকায় ওই এলাকা চোরাচালানের নিরাপদ রুটে পরিণত হয়েছে। একইভাবে বাঁশতলা পেকপাড়া এলাকাও নিরাপদ রুট। ওখানকার ঝুমগাঁও থেকে চাইলেই সীমান্তের ওপারে যাতায়াত করা সম্ভব।
ওই রুট দিয়ে অস্ত্র মাদক, গরুসহ এমন কোন ভারতীয় পণ্য নেই যা বাংলাদেশে প্রবেশ করে না। আবার এপার থেকে মাছসহ যখন যে পণ্য ওখানে চাহিদা সেটি পাচার হয়ে থাকে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, দোয়ারাবাজার উপজেলার বাংলাবাজার ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী এলাকায় বেকারত্ব, দারিদ্র্যতা ও সীমান্তজুড়ে নিরাপত্তা দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে অনেক তরুণ চোরাচালানসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে।
বিজিবি ও পুলিশের তৎপরতায় মাঝে মধ্যে ওখানে কিছু চোরাই পণ্য আটক হয়। স্থানীয়দের দাবি চোরাইকৃত পণ্যের খুব সামান্য পরিমাণই আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে আটক হয়। কেউ কেউ বলেছেন, নবীন হোসাইন রনি ও আব্দুল মালিক নামের আইডি থেকে (দুটোই ইংরেজি আইডি) অস্ত্র হাতে ঘুরাঘুরির ভিডিও দেখে উৎকণ্ঠিত স্থানীয়রা। ভারতীয় সীমানায় গিয়ে বন্দুক হাতে নিয়ে খাসিয়াদের সঙ্গে ঘুরাঘুরিকে তারা সন্দেহের চোখে দেখছেন, ওই তরুণরা খাসিয়াদের যোগসাজসে চোরাচালানসহ নানা সীমান্ত অপরাধ করে থাকতে পারে এমন ধারণা তাদের।
দোয়ারাবাজার থানা পুলিশ দাবি করেছে সীমান্ত অপরাধ দমনে সক্রিয়তার অভাব নেই তাদের। চলতি বছরের এপ্রিল থেকে জুলাই মাসের ১১ তারিখ পর্যন্ত সাড়ে তিন মাসে ৪৬টি চোরাই মামলা দায়ের হয়েছে থানায়। এসব মামলায় বিপুল পরিমাণ মাদকদ্রব্য ও ভারতীয় চোরাই পণ্য উদ্ধার করা হয়েছে।
থানার তথ্য অনুযায়ী, এ সময়ে ৩৪৬ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট, ১৮০ বোতল ফেনসিডিল, ৬৬৯ বোতল বিভিন্ন ব্র্যান্ডের বিদেশি মদ (হুইস্কি, বিয়ার, ভদকা ও অন্যান্য), ১০ লিটার চোলাই মদ এবং ২০ পুরিয়া গাঁজা উদ্ধার করা হয়েছে। এছাড়া মাদক সেবনের অভিযোগেও একটি মামলা রুজু করা হয়েছে।
চোরাচালানবিরোধী অভিযানে ১ লাখ ৪০ হাজার শলাকা ভারতীয় নাসিরউদ্দিন বিড়ি, ৫০ বান্ডিল নাসিরউদ্দিন বিড়ি, ১০ বান্ডিল জীবন বিড়ি, ১২ বস্তা ফুসকা, ১৮ বস্তা চিনি, ১৯ বস্তা জিরা এবং ৫টি ভারতীয় গরু জব্দ করা হয়েছে। এছাড়া ভারতীয় বিভিন্ন প্রসাধনী ও খাদ্যপণ্য উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ১০৮ বক্স স্কিন শাইন ক্রিম, ২ হাজার ১০০টি পন্ডস ব্রাইট বিউটি ফেসওয়াশ, ৪০০টি পন্ডস স্যান্ডাল রেডিয়েন্স ট্যালকম পাউডার, ৯১০টি ঈখঙচ এ ক্রিম, ৩৬টি ভ্যাসমল হেয়ার কালার, ১২টি আমুল স্প্রে শিশুখাদ্য, কিটক্যাট, বেঞ্জো চকলেট, অলিভ অয়েল, প্রিংগলস চিপসসহ বিভিন্ন ভারতীয় পণ্য আটক হয়েছে।
একইভাবে বিজিবিরও নানা ভারতীয় পণ্য ও চোরাই গরু আটকের হিসাব রয়েছে।
দোয়ারা প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক এমএ মোতালিব ভূইয়া বলেন, সীমান্তে কিশোর গ্যাং অপরাধ বেড়েই চলেছে, অস্ত্র দিয়ে টিকটক, মাদকসহ নানা অপরাধে জড়িত হচ্ছে তরুণরা।
স্থানীয় বাসিন্দা ডা. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, প্রশাশনের চোখ ফাঁকি দিয়ে সীমান্তে অবাধে মাদক সেবন বিক্রিসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িত হচ্ছে যুব তরুণরা।
পুলিশ ও বিজিবির দায়িত্বশীলরা বলেছেন, সম্প্রতি ফেসবুক ও টিকটকে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে কয়েকজন যুবককে অস্ত্র হাতে দেখা যায়। প্রাথমিক তদন্তে ধারণা করা হচ্ছে, ভিডিওটি ভারতের মেঘালয় রাজ্যের অভ্যন্তরে ধারণ করা এবং ব্যবহৃত অস্ত্রগুলো ভারতীয় খাসিয়াদের। বিষয়টি নিয়ে বিজিবি ও পুলিশ যৌথভাবে তদন্ত করছে।
পুলিশের একজন কর্মকর্তা জানান, অস্ত্র হাতে নিয়ে ভিডিও প্রচারকারী দুজনের নাম তারা পেয়েছেন, এরা হচ্ছে জুমগাঁও গ্রামের ইদ্রিস আলীর ছেলে সুজন মিয়া ও ইকবাল হোসেনের ছেলে আব্দুর রহিম।
দোয়ারাবাজার থানার ওসি তরিকুল ইসলাম তালুকদার বললেন, অস্ত্র হাতে ভিডিও প্রচারের পর পরই আমরা একজনকে গ্রেপ্তার করেছি। গ্রেপ্তারকৃত হেলাল অস্ত্রসহ প্রচার হওয়া যুবক সুজনের ভাই হেলাল। ওকে আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে। অন্যদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (মিডিয়া) সুজন সরকার বলেন, পুলিশ এই বিষয়টি গভীরভাবে তদন্ত করছে। তদন্ত শেষে অপরাধের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সুনামগঞ্জ ২৮ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল এ কে এম জাকারিয়া কাদির বললেন, খাসিয়াদের সঙ্গে অস্ত্র হাতে ঘুরাঘুরি ভিডিও দেখার পর ছবির তরুণদের নাম ঠিকানা পুলিশকে দেওয়া হয়েছে। একজন গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। সীমান্তে সামাজিক সচেতনতামূলক সভা করা হয়েছে। বিজিবি মনে করছে খাসিয়াদের সঙ্গে সখ্যতা গড়ে ওঠা তরুণরা সীমান্ত চোরাচালানের সঙ্গে যুক্ত থাকতেও পারে। এরা যাতে এপারে এসে কোন অঘটন না ঘটাতে এজন্য বিজিবিকে সতর্ক করে দেওয়া হয়েছে।
Leave a Reply