পারভেজ আহমদ ::: ব্রিটিশ হাই কমিশনের তদন্তে ফাঁস ভয়াবহ অনিয়ম, সিসিকও স্বীকার করল জাল সনদের সত্যতা। তবু ধরা পড়েনি মূল হোতা। প্রশাসনিক অবহেলা, সার্ভারের নিরাপত্তা ও অভ্যন্তরীণ যোগসাজশ নিয়ে উঠছে গুরুতর প্রশ্ন।
বিদেশে উচ্চশিক্ষা, কর্মসংস্থান কিংবা স্থায়ীভাবে বসবাসের ক্ষেত্রে জন্মনিবন্ধন সনদ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় দলিল। সেই দলিলই যদি জাল হয়, তাহলে শুধু একজন ব্যক্তির নয়, প্রশ্নবিদ্ধ হয় পুরো রাষ্ট্রীয় নিবন্ধন ব্যবস্থা। সম্প্রতি যুক্তরাজ্যে ভিসা আবেদন করতে গিয়ে এমনই এক ভয়াবহ জালিয়াতির ঘটনা সামনে এসেছে, যেখানে সিলেট সিটি করপোরেশন (সিসিক) থেকে ইস্যুকৃত ১১টি জন্মনিবন্ধন সনদ ভুয়া বলে শনাক্ত করেছে ব্রিটিশ হাই কমিশন। পরে সিসিকের নিজস্ব তদন্তেও সনদগুলো জাল বলে প্রমাণিত হলেও, রহস্যজনকভাবে এখনো শনাক্ত হয়নি এই জালিয়াতির নেপথ্যের ব্যক্তি বা চক্র।
ঘটনাটি শুধু কয়েকটি ভুয়া সনদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি রাষ্ট্রীয় তথ্যভান্ডারের নিরাপত্তা, প্রশাসনিক জবাবদিহি এবং সরকারি নিবন্ধন ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। কারণ জন্মনিবন্ধন তৈরি বা সংশোধনের জন্য সরকারি সার্ভারে প্রবেশাধিকার ছাড়া এমন কাজ সম্ভব নয় বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
জানা গেছে, সিলেট বিভাগ থেকে যুক্তরাজ্যে যাওয়ার উদ্দেশ্যে কয়েকজন আবেদনকারী ভিএফএস গ্লোবালের মাধ্যমে ভিসার আবেদন করেন। নিয়ম অনুযায়ী আবেদনকারীদের সব কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করে ব্রিটিশ হাই কমিশন। যাচাইয়ের সময় ১১টি জন্মনিবন্ধন সনদের তথ্য সরকারি রেকর্ডের সঙ্গে মিল না থাকায় সেগুলো ভুয়া হিসেবে শনাক্ত করা হয়।
এরপর বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে সিসিককে জানানো হলে গত ৭ মে প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ও নিবন্ধক ডা. মো. জাহিদুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এক জরুরি বিজ্ঞপ্তিতে ওই ১১টি জন্মনিবন্ধন স্থায়ীভাবে বাতিল করা হয়। তালিকায় সিলেট সিটি করপোরেশনের ২৩ নম্বর ওয়ার্ড, বিশ্বনাথ, সুনামগঞ্জের দিরাই, শান্তিগঞ্জ ও ছাতক উপজেলার বাসিন্দাদের নাম রয়েছে।
এদিকে, ব্রিটিশ হাই কমিশনের যাচাই প্রতিবেদনে সিসিকের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মো. জাহিদুল ইসলাম এবং সহকারী নিবন্ধক নজরুল ইসলামের প্রশাসনিক দুর্বলতা ও দায়িত্ব পালনে অবহেলার বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে। এর ভিত্তিতে চলতি বছরের ২৭ এপ্রিল স্থানীয় সরকার বিভাগের অধীন রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিয়ে চিঠি পাঠায়।
তবে ঘটনার সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক হলো জাল সনদ প্রমাণিত হলেও এখনো কেউ গ্রেপ্তার হয়নি, কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীর বিরুদ্ধে দৃশ্যমান শাস্তিমূলক ব্যবস্থাও নেওয়া হয়নি। এতে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে, এত বড় জালিয়াতির পেছনে কি কেবল বাইরের কোনো চক্র, নাকি সরকারি দপ্তরের ভেতরেও রয়েছে প্রভাবশালী কোনো সিন্ডিকেট?
সিসিক এ ঘটনায় একটি তদন্ত কমিটি গঠন করলেও সেই তদন্ত নিয়েও রয়েছে বিতর্ক।
অভিযোগ রয়েছে, তদন্ত কমিটি মাঠপর্যায়ে কোনো অনুসন্ধান না চালিয়ে কেবল অফিসের নথিপত্র যাচাই করেই প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। ফলে প্রকৃত জালিয়াতদের শনাক্ত করার পরিবর্তে তদন্ত কেবল ভুয়া সনদ বাতিলেই সীমাবদ্ধ থেকেছে।
সিসিকের স্বাস্থ্য শাখার ডাটা এন্ট্রি অপারেটর মো. নাসিম মিয়া বলেন, “নিয়ম অনুযায়ী প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যাচাই করেই তদন্ত করা হয়েছে।”
অন্যদিকে প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মো. জাহিদুল ইসলাম দাবি করেন, তদন্তে কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীর সরাসরি সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে তিনি স্বীকার করেন, একটি সংঘবদ্ধ চক্র এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে। কিন্তু সেই চক্র কারা, কীভাবে তারা সরকারি নিবন্ধন ব্যবস্থায় প্রবেশাধিকার পেল কিংবা কার সহযোগিতায় ভুয়া সনদ তৈরি হলো এসব প্রশ্নের কোনো উত্তর তদন্ত প্রতিবেদনে নেই।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জন্মনিবন্ধনের মতো সংরক্ষিত সরকারি ডাটাবেজে ভুয়া তথ্য যুক্ত হওয়া অত্যন্ত উদ্বেগজনক। কারণ যথাযথ অনুমতি বা অবৈধ প্রবেশাধিকার ছাড়া এ ধরনের তথ্য সংযোজন বা পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। তাই বিষয়টি কেবল প্রশাসনিক অবহেলার নয়; প্রয়োজন হলে ডিজিটাল ফরেনসিক তদন্তের মাধ্যমেও প্রকৃত দায়ীদের শনাক্ত করা উচিত।
এ বিষয়ে সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী বলেন, “যারা এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত, তাদের অবশ্যই আইনের আওতায় আনা হবে। বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে আমার কাছে এলে তদন্তের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
Leave a Reply