সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলার চিকনাগুল বাজারে ঈদুল আজহা উপলক্ষে মাত্র পাঁচ দিনের জন্য ইজারা দেওয়া অস্থায়ী পশুর হাট নির্ধারিত সময়সীমা শেষ হওয়ার প্রায় দেড় মাস পরও অবৈধভাবে চালু থাকায় অবশেষে নড়েচড়ে বসেছে উপজেলা প্রশাসন। সরকারি অনুমোদনের মেয়াদ শেষ হলেও সেখানে নিয়মিত পশু কেনাবেচা, হাসিল আদায় এবং রসিদ বিতরণ চলছিল বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে সরকার বিপুল রাজস্ব হারানোর পাশাপাশি উপজেলার স্থায়ী পশুর হাটের বৈধ ইজারাদাররা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।
বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) দুপুরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মিজ সুনন্দা রায়ের নির্দেশনায় উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. মনিরুল ইসলামের নেতৃত্বে চিকনাগুল বাজারে অভিযান পরিচালনা করা হয়। অভিযানে বাংলাদেশ চা বোর্ডের জায়গায় নির্মিত অবৈধ গরুর শেড উচ্ছেদ করা হয়। একই সঙ্গে বাজার-সংশ্লিষ্টদের তিন দিনের মধ্যে সব অবৈধ স্থাপনা অপসারণ এবং বাজার পরিচালনার বৈধতা-সংক্রান্ত সব কাগজপত্র উপজেলা প্রশাসনের কাছে জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নির্দেশনা অমান্য করলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ারও হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।
প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, গত ২১ মে জৈন্তাপুর উপজেলা প্রশাসন ঈদুল আজহা উপলক্ষে চিকনাগুল বাজারে ২৪ থেকে ২৯ মে পর্যন্ত মাত্র পাঁচ দিনের জন্য অস্থায়ী পশুর হাটের ইজারা দেয়। সরকারি ইজারায় চিকনাগুল ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য মছদ্দর আলীর ছেলে ইকবাল হোসেনের নামে হাটটি ইজারা নেওয়া হয়।
কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, নির্ধারিত পাঁচ দিনের ইজারা শেষ হওয়ার পরও বাজারটি বন্ধ না করে আগের মতোই পরিচালনা করা হয়। সেখানে নিয়মিত পশু কেনাবেচা চলার পাশাপাশি ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে হাসিল আদায় করা হচ্ছিল এবং আনুষ্ঠানিক রসিদও দেওয়া হচ্ছিল।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান কামরুজ্জামান চৌধুরীর প্রত্যক্ষ মদদে সাবেক ইউপি সদস্য কামাল আহমদসহ কয়েকজন ব্যক্তি দীর্ঘদিন ধরে বাজার পরিচালনা ও হাসিল আদায়ের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। এমনকি ব্যবসায়ীদের দেওয়া হাসিলের রসিদে কামাল আহমদের নাম ও মোবাইল নম্বর ব্যবহার করা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
আরও গুরুতর অভিযোগ হলো, অবৈধভাবে পরিচালিত এই পশুর হাটে সীমান্তবর্তী এলাকা দিয়ে আসা চোরাই ভারতীয় পশুর একটি অংশও বিক্রি হতো। স্থানীয়দের দাবি, মহাসড়কের পাশে হওয়ায় বাজারটিতে সীমান্ত থেকে পশু আনা সহজ ছিল এবং সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে অসাধু চক্র সক্রিয় হয়ে ওঠে।
আলীরগাঁও ইউনিয়নের পশু ব্যবসায়ী আব্দুল জলিল বলেন, নির্ধারিত সময় শেষে বাজার চালানোর কোনো বৈধতা ছিল না। অথচ দীর্ঘদিন ধরে সেখানে প্রকাশ্যে পশু কেনাবেচা হয়েছে, হাসিল আদায় হয়েছে এবং প্রশাসনের নজর এড়িয়েই কার্যক্রম চলেছে।
ঈদের সময়ের ইজারাদার ইকবাল হোসেন বর্তমানে প্রবাসে থাকায় তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে সাবেক ইউপি সদস্য কামাল আহমদ দাবি করেন, বাজার পরিচালনার বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না। রসিদে তাঁর নাম ও মোবাইল নম্বর ব্যবহারের বিষয়ে তিনি বলেন, পাঁচ দিনের ইজারার সময় অংশীদাররা তাঁর নাম ব্যবহার করেছিলেন। একই সঙ্গে তিনি স্বীকার করেন, পুরো বিষয়টি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান কামরুজ্জামান চৌধুরী দেখভাল করতেন।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে চেয়ারম্যান কামরুজ্জামান চৌধুরীর সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। এর আগে বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে তিনি শুধু বলেন, “নিউজ করার দরকার নেই।
অবৈধভাবে পরিচালিত এই পশুর হাট নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন উপজেলার স্থায়ী পশুর হাটের ইজারাদাররা। তাঁদের অভিযোগ, সরকারি অনুমোদন ছাড়া দীর্ঘদিন বাজার পরিচালনার ফলে সরকার যেমন বিপুল রাজস্ব হারিয়েছে, তেমনি বৈধভাবে ইজারা নেওয়া স্থায়ী পশুর হাটগুলোও ব্যবসায়িকভাবে মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়েছে। তাঁরা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
অভিযান শেষে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. মনিরুল ইসলাম বলেন, অস্থায়ী পশুর হাটের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও বাজার পরিচালিত হওয়ার অভিযোগের ভিত্তিতে অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। বাংলাদেশ চা বোর্ডের জায়গায় নির্মিত অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়েছে। ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দের অনুরোধে তিন দিনের সময় দেওয়া হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে সব অবৈধ স্থাপনা অপসারণ করতে হবে এবং বাজার পরিচালনার বৈধতা-সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় কাগজপত্র উপজেলা প্রশাসনের কাছে জমা দিতে হবে। এরপর আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মিজ সুনন্দা রায় বলেন, চিকনাগুল হাটবাজার ব্যবস্থাপনা কমিটির মাধ্যমে বাজার পরিচালিত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। এ বিষয়ে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানকে লিখিতভাবে ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়েছে। তাঁর জবাব পাওয়ার পর বাজারের বৈধতা, পরিচালনার দায়িত্বে কারা ছিলেন এবং কোনো অনিয়ম হয়েছে কি না এসব বিষয় যাচাই করে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
Leave a Reply