ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের বাকি আর মাত্র একদিন। ভোটগ্রহণের সময় ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে সিলেট-৫ আসনে ভোট রাজনীতির সমীকরণ জটিল থেকে জটিল হয়ে নাটকীয় রূপ নিচ্ছে। মঙ্গলবার সকাল সাড়ে সাতটা থেকে আনুষ্ঠানিক প্রচার-প্রচারণা বন্ধ হলেও মাঠে উত্তেজনা একটুও কমেনি। প্রার্থী ও তাদের সমর্থকেরা নীরব কৌশল আর অঙ্ক কষায় ব্যস্ত সময় পার করছেন। ভোটারদের প্রত্যাশা সব শঙ্কা ছাপিয়ে একটি শান্তিপূর্ণ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন। প্রশাসনও সেই লক্ষ্যে ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে। প্রতিটি ভোটকেন্দ্র সিসি ক্যামেরাদ্বারা বেষ্টিত করা হয়েছে। তবুও ভোটারদের মনে রয়েছে নানা শঙ্কা। জকিগঞ্জ ও কানাইঘাট উপজেলা নিয়ে গঠিত এই আসনে এবারের নির্বাচন পরিণত হয়েছে ত্রিমুখী হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ে।
উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তার কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দুই উপজেলা মিলিয়ে এখানে মোট ভোটার সংখ্যা ৪ লাখ ২৮ হাজার ৭৪৬ জন প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন বিএনপি-জমিয়ত জোট মনোনীত প্রার্থী বাংলাদেশ উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় সভাপতি মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুক (খেজুর গাছ), ১১ দলীয় জোট মনোনীত খেলাফত মজলিসের মনোনীত প্রার্থী মুফতি মোহাম্মদ আবুল হাসান (দেওয়াল ঘড়ি), বিএনপির বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থী মামুনুর রশীদ চাকসু মামুন (ফুটবল), বাংলাদেশ মুসলিমলীগ মনোনীত প্রার্থী মো. বিলাল উদ্দিন (হারিকেন)।
মঙ্গলবার উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে মাঠপর্যায়ের চিত্র বিশ্লেষণে স্পষ্টভাবে দেখা গেছে এ আসনে ত্রিমুখী শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে। বিএনপি-জমিয়ত জোটের প্রার্থী, জামায়াত জোটের প্রার্থী ও বিএনপি বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থীর মধ্যে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। এ তিন প্রার্থীর মধ্যে কেউই একচেটিয়া সুবিধাজনক অবস্থানে নেই।
এ আসনে বিএনপি জোটের প্রার্থী হয়ে জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের কেন্দ্রীয় সভাপতি মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুক খেজুরগাছ প্রতীকে নির্বাচন করছেন। এই আলেম প্রার্থী ভরসা রাখছেন বিএনপির সমর্থন, জমিয়তের সাংগঠনিক ভোট এবং কওমি ঘরানার বড় একটি অংশের ওপর। কিন্তু এই সমীকরণে বড় ছন্দপতন ঘটিয়েছেন জেলা বিএনপির সহসভাপতি মামুনুর রশীদ ‘চাকসু মামুন’। দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে ফুটবল প্রতীক নিয়ে পুরো নির্বাচনেই নতুন মেরুকরণ করেন।
তবে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে মামুনুর রশীদকে বিএনপি থেকে বহিষ্কার করা হলেও বাস্তবতায় ভোটের মাঠে এতে প্রভাব কমেনি। বরং জকিগঞ্জ ও কানাইঘাটের বিএনপি এবং অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের একটি বড় অংশ প্রকাশ্যে কিংবা নীরবে তার পাশেই দাঁড়িয়ে আছে। এরমেধ্যে অনেককেই ইতোমধ্যে বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠন থেকে বহিস্কার করা হয়েছে। সর্বশেষ সোমবার রাতে জকিগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সভাপতি শফিকুর রহমান, জকিগঞ্জ সরকারি কলেজ ছাত্রদলের সভাপতি শাব্বির আহমদ ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক তাওহীদ হাসান তানিমকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। এর আগে উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ইসমাইল হোসেন সেলিম, উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক কামরুল ইসলাম, জকিগঞ্জ পৌরসভা বিএনপিসহ উপজেলা পর্যায়ের অঙ্গ সংগঠনের একাধিক নেতা এবং কানাইঘাট উপজেলার কয়েকজন নেতাকে বহিষ্কার করা হয়। এরপরও বিদ্রোহী প্রার্থীর প্রচারণা থেকে দলের বড় অংশকে সরাতে পারেনি দলটি।
এতে করে ধারণা করা হচ্ছে, বিএনপির তৃণমূল পর্যায়ে বিদ্রোহী প্রার্থী চাকসু মামুন বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে সক্ষম হয়েছেন, যা বিএনপি-জমিয়ত জোটের প্রার্থী মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুকের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বহিস্কৃত নেতাকর্মীদের ভাষ্যমতে, বারবার জোটের প্রার্থী চাপিয়ে দেওয়ায় তৃণমূলে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ জমেছিল, আর সেই ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটেছে এবারের নির্বাচনে। শেষ পর্যন্ত বিএনপির বহিস্কৃত নেতাকেই তারা নির্বাচিত করে বিএনপিকে উপহার দেবেন।
অন্যদিকে, জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে খেলাফত মজলিসের মুফতি মোহাম্মদ আবুল হাসান দেওয়াল ঘড়ি প্রতীক নিয়ে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছেন। তাঁর বড় পূঁজি কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক ভোটের বড় একটি অংশ, জামায়াতের ভোট ব্যাংক ও ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা ও সাম্প্রদায়িক ভোট ব্যাংক এককভাবে তার দিকেই ঝুঁকেছে। বিশেষ করে জকিগঞ্জ উপজেলায় নিজ এলাকার ভোট এবং কওমি অঙ্গনের সমর্থন তাঁকে বাড়তি সুবিধা দিচ্ছে। তবে নির্বাচনে কওমি ঘরানার দুই শীর্ষ আলেমের প্রতিদ্বন্দ্বিতা করায় ধর্মভিত্তিক ভোটব্যাংককেও বিভক্ত করেছে। এক বলয়ের ভেতর এই বিভাজনের সুযোগেই বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থী তুলনামূলক সুবিধাজনক অবস্থান তৈরি করেছেন বলে অনেকের ধারণা।
এদিকে, ত্রিমুখী লড়াইয়ে সবচেয়ে বড় অজানা ফ্যাক্টর হিসেবে আলোচনার শীর্ষে রয়েছে আল্লামা আব্দুল লতিফ চৌধুরী (ফুলতলী পীর সাহেব) অনুসারীগণের ভোটব্যাংক।
সিলেট-৫ আসনে ফুলতলী কেন্দ্রীক ভোটের প্রভাব দীর্ঘদিনের। অতীতের নির্বাচনগুলোতে এই ভোটব্যাংক যেদিকে গেছে, ফলাফলও অনেকটাই সেদিকেই হেলে পড়েছে। ২০২৪ সালের নির্বাচনে ফুলতলী পীর সাহেবের ছেলে মাওলানা হুছামুদ্দীন চৌধুরী স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে জয়ী হলেও এবার তিনি প্রার্থী নন। দলীয়ভাবেও আল ইসলাহ কাউকে সরাসরি সমর্থন দেয়নি। ফলে এই বিশাল ভোটব্যাংক আপাতত উন্মুক্ত থাকলেও শেষ মুহূর্তে কোনো এক সমীকরণে তারা নির্ণায়ক ভূমিকা রাখতে পারে এমন জল্পনা চলছে। বিএনপি জোট ও জামায়াত জোটসহ স্বতন্ত্র প্রার্থী ফুলতলী ছাহেব বাড়িতে গিয়ে দোয়া ও সৌজন্য সাক্ষাতের মাধ্যমে নিজেদের পক্ষে ওই ভোট ব্যাংক টানার চেষ্টা করেছেন। অপরদিকে, ফলাফলে সংখ্যালঘু ও নীরব ভোটাররাও বড় ভূমিকা রাখবেন। জকিগঞ্জ ও কানাইঘাটে সংখ্যালঘু ভোটারের সংখ্যা খুব বড় না হলেও তারা সাধারণত একমুখী ভোট দিয়ে থাকেন এবং ফলাফলে প্রভাব রাখেন।
সংখ্যালঘু একাধিক ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে মতে, এবার একটি বড় অংশ দলীয় পরিচয়ের চেয়ে প্রার্থীর ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা ও স্থানীয় সম্পর্ককে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। এতে করে স্বতন্ত্র প্রার্থী মামুনুর রশীদের দিকে এই ভোটের একটি অংশ ঝুঁকতে পারে বলে ধারণা পাওয়া গেছে। পাশাপাশি আওয়ামী লীগ সমর্থিত ভোটারদের একটি অংশ নীরবে ভোট দিতে পারেন এমন গুঞ্জনও রয়েছে।
স্থানীয় রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, শেষ পর্যন্ত ভোটের মাঠে ফুলতলী ছাহেব বাড়ির অনুসারী, জাতীয় পার্টি, সংখ্যালঘু ও সাম্প্রদায়িক ভোটব্যাংক এবং নীরব ভোটারদের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত ফলাফলের হিসাব-নিকাশে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারে। অদৃশ্য এই ভোটশক্তির সামান্য দিক পরিবর্তনেই সিলেট-৫ আসনে ঘটতে পারে নাটকীয় উত্থান-পতন। ভোটের দিন এই অদৃশ্য ভোটের শক্তিগুলোই বলে দেবে শেষ হাসি কার মুখে। প্রত্যেক প্রতিদ্বন্দ্বি প্রার্থী এসব ভোট ব্যাংকের আশায় বিজয়ের ব্যাপারে আশাবাদী। শেষ পর্যন্ত যিনিই বিজয়ী তিনি কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখী হবেন।
Leave a Reply