সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার উপজেলার নরসিংপুর ইউনিয়নে টাকার লোভে এক শ্রেণির জমির মালিকদের নদীর পাড় বিক্রি ও প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের বালু লুটের তাণ্ডবে মানচিত্র থেকে মুছে যাচ্ছে একের পর এক গ্রাম। স্থানীয় ইজারাদার ও প্রভাবশালী বালু খেকোরা আইন-কানুনের তোয়াক্কা না করে দিন-দুপুরে সোনালীচেলা নদীর পাড় কেটে বালু লুটপাট করায় শুষ্ক মৌসুমেও নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে শত শত একর ফসলি জমি ও বসতভিটা।
ভুক্তভোগী এলাকাবাসীর অভিযোগ, জেলা প্রশাসন প্রতিবছর মোটা অঙ্কের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যে পরিবেশগত সমীক্ষা ছাড়াই সোনালীচেলা নদীটিকে বালুমহাল হিসেবে ইজারা দিচ্ছে, কিন্তু নদীতে পর্যাপ্ত বালু না থাকায় ইজারাদারের লোকজন স্থানীয় সিন্ডিকেটের সাথে যোগসাজশে পাড় কেটে বালু সংগ্রহ করছে। গত দুই বছরে পাড় কাটার ফলে সারপিনপাড়া গ্রামের শতাধিক পাকা ও কাঁচা ঘরবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। নদী ভাঙনের কবলে সারপিনপাড়া, পূর্বচাইরগাঁও, সোনাপুর, রহিমের পাড়া ও নাছিমপুরসহ আশপাশের ছয়টি গ্রাম এখন অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে।
সোনাপুর গ্রামের বাসিন্দারা জানান, নদীর পাড় সংলগ্ন রেকর্ডীয় জমির মালিকরা নগদ টাকার বিনিময়ে বালু ব্যবসায়ীদের কাছে পাড় বিক্রি করে দিচ্ছেন, যা পুরো এলাকার জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি বিক্রির অজুহাতে ব্যবসায়ীরা পাড় কেটে গভীর থেকে বালু তোলায় নদীর গতিপথ পরিবর্তিত হয়ে তীব্র ভাঙন দেখা দিয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় একাধিক ব্যক্তি জানান, সোনাপুর গ্রামের বাবুল, হাবিরুন নেছা, জাহাঙ্গীর, শাহীন, আক্তার, ইসমাঈল, জাবেদ, ফারদিল, রুহেল, মিয়াচান, কালা মিয়াসহ নদীর পাড়ের জমির ২০-২৫ জন মালিক বালু খেকোদের কাছে তাদের জমির পাড় বিক্রি করে দিচ্ছেন। স্থানীয় ভাবে প্রভাবশালী হওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে কেউ কিছু বলতেও পারছেন না।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সোনাপুর গ্রামের জমির মালিক রোয়াব আলী। তিনি বলেন, “আমি পাড় বিক্রির সাথে জড়িত নই। বরং আমি নিজেই ভুক্তভোগী। রাতে আধারে আমার জমির পাড় কেটে নিয়ে যাচ্ছে বালু খেকোরা। আমি ওসি এবং ইউএনও মহোদয়কেও জানিয়েছি সরেজমিনে এসে তদন্ত করার জন্য।”
একই গ্রামের রুহেল মিয়াও অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, “সরজমিনে আসলে দেখতে পারবেন কেবলমাত্র আমার জমির পাড় এখনো অক্ষত আছে। আমার আশপাশের প্রায় সবার জমির পাড় কেটে নিয়ে গেছে। আমি পাড় বিক্রি না করায় আমার জমির পাড়ও কেটে নিয়ে যাচ্ছে। দিনে রাতে পাহাড়া দিয়ে পাড় কাটা বন্ধ করতে পারছিনা। আমি প্রশাসনকেও জানিয়েছি।”
স্থানীয় এক জনপ্রতিনিধি জানান, নদী পাড় ব্যক্তিগত সম্পত্তি হলেও তা কাটা দণ্ডনীয় অপরাধ, তবে প্রভাবশালী মহলের চাপে এটি নিয়ন্ত্রণ করা দুঃসাধ্য হয়ে পড়েছে।
দোয়ারাবাজার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোঃ তরিকুল ইসলাম তালুকদার জানান, অভিযোগ পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়েছে। পাড় কেটে বালু উত্তোলনের অভিযোগে ইতিমধ্যে ২০-২২ জনের বিরুদ্ধে একটি মামলা রেকর্ড করা হয়েছে।
দোয়ারাবাজার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অরূপ রতন সিং জানিয়েছেন, টাকার বিনিময়ে পাড় বিক্রি ও বালু উত্তোলনের বিষয়টি গুরুত্বের সাথে দেখা হচ্ছে । এ ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা দায়ের করা হয়েছে।
Leave a Reply