পারভেজ আহমদ :::: সিলেট বিভাগের কৃষি খাতে এক অভাবনীয় পরিবর্তনের লক্ষ্য নিয়ে বড় পরিসরের উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নিয়েছে সরকার। মূলত ভূ-উপরিস্থ পানির কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধিতে ‘সিলেট বিভাগে ভূ-উপরিস্থ পানি ব্যবস্থাপনা ও ব্যবহারের মাধ্যমে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি প্রকল্প’ শীর্ষক এই উদ্যোগটি বাস্তবায়িত হচ্ছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে শুরু হয়ে ২০২৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত পাঁচ বছর মেয়াদি এই প্রকল্পে ব্যয় ও কর্মযজ্ঞের পরিধি এ অঞ্চলের কৃষিচিত্র বদলে দেবে বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রকল্পের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হলো সিলেট বিভাগের ৪০টি উপজেলায় ১৯৮টি আধুনিক সেচ যন্ত্র স্থাপন। এর মাধ্যমে নদী, খাল ও পাহাড়ি ছড়ার পানিকে সরাসরি কৃষিজমিতে পৌঁছে দেওয়া হবে।
আধুনিক প্রযুক্তিসম্পন্ন এসব সেচ যন্ত্রের মধ্যে রয়েছে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন লো-লিফট পাম্প (এলএলপি), ৪০টি ফোর্সমোড এবং ৪০টি আর্টেশিয়ান নলকূপ। এই সমন্বিত উদ্যোগের ফলে সিলেট অঞ্চলের প্রায় ১৭ হাজার ১৯ হেক্টর জমি স্থায়ী সেচ সুবিধার আওতায় আসবে, যা আগে পানির অভাবে অনাবাদি থাকত।
প্রকল্পের কারিগরি দিক ও মাঠ পর্যায়ের প্রভাব নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। বিএডিসি গোয়াইনঘাটের উপসহকারী প্রকৌশলী মো. আ. কুদ্দুস বলেন, ‘আমরা ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমাতে মাটির নিচ দিয়ে আধুনিক সেচ নালা (বারিড পাইপলাইন) তৈরি করছি। এতে জমির অপচয় যেমন কমছে, তেমনি সেচ যন্ত্র স্থাপনে কৃষকদের আগ্রহও দিন দিন বাড়ছে। এটি পরিবেশ রক্ষায় বড় ভূমিকা রাখবে।’
সিলেটের সহকারী প্রকৌশলী মো. হাবিবুর রহমান বলেন, ‘ভূ-উপরিস্থ পানির ব্যবহার অত্যন্ত পরিবেশবান্ধব এবং সাশ্রয়ী। এই পদ্ধতি বজায় রাখা গেলে উৎপাদন খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে এবং দীর্ঘমেয়াদে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা পাবে।’
বিএডিসির প্রকল্প পরিচালক (পিডি) প্রনজিত কুমার দেব এই মেগা প্রকল্পের মূল লক্ষ্য ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরে বলেন, ‘সিলেট অঞ্চলের কৃষিতে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচনে আমাদের এই সমন্বিত মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন হচ্ছে।
আমাদের প্রধান লক্ষ্য হলো আগামী পাঁচ বছরে বিভাগের ৪০টি উপজেলায় ১৯৮টি অত্যাধুনিক সেচ যন্ত্র স্থাপনের মাধ্যমে ১৭ হাজার ১৯ হেক্টর জমিকে স্থায়ী সেচ সুবিধার আওতায় আনা। এর ফলে প্রতি বছর সিলেট অঞ্চলে অতিরিক্ত ৫১ হাজার ৫৮ মেট্রিকটন খাদ্যশস্য উৎপাদিত হবে, যা এ অঞ্চলের বর্তমান উৎপাদন ক্ষমতাকে প্রায় ৩৫ শতাংশ বাড়িয়ে দেবে।’
তিনি আরও বলেন, আমরা কেবল উৎপাদন বৃদ্ধি নয়, বরং পানির অপচয় রোধ ও দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্বের ওপর জোর দিচ্ছি। প্রকল্পের অধীনে ২২১ কিলোমিটার খাল ও পাহাড়ি ছড়া পুনঃখনন এবং ১০৫ কিলোমিটার সংস্কার করা হবে। আধুনিক ‘বারিড পাইপলাইন’ ও ‘স্প্রিংকলার’ সেচ পদ্ধতির ব্যবহার নিশ্চিত করা হচ্ছে যাতে কম পানি ব্যবহার করে সর্বোচ্চ ফলন পাওয়া যায়।
এই প্রকল্পের সফল বাস্তবায়ন শুধু অনাবাদি জমিকে চাষের আওতায় আনবে না, বরং কৃষকের উৎপাদন খরচ কমিয়ে তাদের জীবনমান আমূল বদলে দেবে এবং জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা জোরদারে এক বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখবে।
প্রকল্পটি শুধু সেচ ব্যবস্থার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; কৃষকদের সুবিধার্থে আরও কিছু অবকাঠামো নির্মাণ করা হবে। এর মধ্যে রয়েছে কৃষিপণ্য ও যন্ত্রাদি পরিবহনের জন্য ১০ কিলোমিটার আরসিসি রাস্তা নির্মাণ। ফসল মাড়াই ও শুকানোর জন্য ৫টি আধুনিক থ্রেসিং ফ্লোর। ছোট-বড় মিলিয়ে ৯০টি পানি নিয়ন্ত্রণ অবকাঠামো বা রেগুলেটর স্থাপন।
সংশ্লিষ্টদের মতে, এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে সিলেটে ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। বিশেষ করে পাহাড়ি ছড়া ও খালের পানি ব্যবহার করে সেচ খরচ কমানো সম্ভব হবে বলে কৃষকরা সরাসরি আর্থিকভাবে উপকৃত হবেন। এ ছাড়া কৃষিকাজে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার নারীদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি করবে এবং দারিদ্র্য বিমোচনেও এটি মাইলফলক হিসেবে কাজ করবে।
প্রকৃতি ও পাহাড় ঘেরা সিলেটের কৃষকদের দীর্ঘদিনের পানির হাহাকার এখন এই প্রকল্পের মাধ্যমে সোনালি স্বপ্নে রূপ নিতে যাচ্ছে। ২০২৯ সালের মধ্যে প্রকল্পটি সম্পন্ন হলে সিলেটের কৃষি খাতে এক দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
Leave a Reply