দেশে মানব পাচারের সবচেয়ে বড় শিকার হচ্ছেন নারীরা। বিদেশে চাকরি, বিয়ে ও উচ্চআয়ের প্রতিশ্রুতি কিংবা উন্নত জীবনের স্বপ্ন দেখিয়ে সংঘবদ্ধ চক্র নারীদের টার্গেট করছে। এ ক্ষেত্রে সীমান্তবর্তী, পাহাড়ি এবং অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা জেলার নারীরা এখন সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন বলে সিআইডি সূত্রে জানা গেছে।
অন্যদিকে প্রতি মাসে অন্তত ১২৫ জন ভিকটিম নারী-পুরুষকে মানব পাচারের শিকারের ঘটনায় উদ্ধার করা হয়। বাস্তবে এই অপরাধ জগতে শিকারের সংখ্যা অনেক বেশি বলে ধারণা রয়েছে। এ ছাড়া গত বছরের গ্লোবাল অর্গানাইজড ক্রাইম ইনডেক্সের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে মানব পাচারই এখন সবচেয়ে বড় আন্তঃসীমান্ত অপরাধ বলে তথ্য উঠে এসেছে। তবে এই পাচার রুখতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতিনিয়ত অভিযান চললেও যেন নানা সিন্ডিকেটের সমন্বয়ে বেড়েই চলছে এই অপরাধ। অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) সূত্র মতে, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে মার্চ মাত্র তিন মাসেই ১৬৭ জন মানব পাচারকারী গ্রেফতার হয়েছে। উদ্ধার করা হয় ২৩৩ জন ভুক্তভোগীকে। যেসব ঘটনায় ১৩১টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। তবে এটি কেবল শনাক্ত হওয়া ঘটনার হিসাব, প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি বলে ধারণা করা হচ্ছে।
অন্যদিকে ২০২৫ সালের জানুয়ারি মাস থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সারা দেশে গ্রেফতার হয়েছে ৯৮১ জন মানব পাচারকারী।
একই সময়ে পাচারকালে মোট ১ হাজার ৬৪৮ জন ভুক্তভোগীকে উদ্ধার করা হয়েছে এবং এ সংক্রান্ত মোট ১ হাজার ১২৬টি মামলা রুজু হয়েছে।
এ ছাড়া গত দুই বছরে মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন, ২০১২-এর আওতায় সিআইডিতে রুজুকৃত মামলার সংখ্যা ৩১৮টি। এর মধ্যে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে কিংবা বিদেশি নাগরিকদের কাছে নারী পাচারসংক্রান্ত মামলা ৯টি। সংস্থাটির তথ্য মতে, ঢাকা, যশোর, ঝিনাইদহ, জামালপুর, চাঁদপুর, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবনের নারীরা মানব পাচারের ঘটনায় বেশি ভিকটিম হচ্ছেন। এর মধ্যে সীমান্তবর্তী ও পাহাড়ি এলাকায় দালাল চক্রের সক্রিয়তা তুলনামূলকভাবে বেশি।
তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, সীমান্ত ব্যবহার করে অবৈধভাবে ভারতসহ বিভিন্ন দেশে পাচারের চেষ্টা যেমন রয়েছে, তেমনই মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে চাকরি কিংবা বিয়ের প্রলোভন দেখিয়েও নারীদের নিয়ে যাওয়া হয়। অনেক ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচয় গড়ে তুলে প্রেমের সম্পর্কের অভিনয় করে পরে পাচার করা হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দারিদ্র্য, বেকারত্ব, পারিবারিক অস্থিরতা, অল্প বয়সে বিয়ের চাপ, নিরাপদ অভিবাসন সম্পর্কে অজ্ঞতা ও অনলাইনে প্রতারণামূলক যোগাযোগ এসব কারণ নারীদের সহজ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করছে। এ ছাড়া অনেক নারী বিদেশে গৃহকর্মী বা অন্যান্য পেশায় কাজের আশায় দালালদের ওপর নির্ভর করেন। বৈধ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করায় অনেকেই পরে পাচার চক্রের ফাঁদে পড়েন।
অন্যদিকে গত বছরের গ্লোবাল অর্গানাইজড ক্রাইম ইনডেক্সের তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে মানব পাচারই এখন সবচেয়ে বড় আন্তঃসীমান্ত অপরাধ। যেখানে মানব পাচারের ভয়াবহতার ১০ পয়েন্টে বাংলাদেশের সূচক মান ৮ রয়েছে। তবে সিআইডি বলছে, মানব পাচার প্রতিরোধে নিয়মিত গোয়েন্দা নজরদারি, তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক অনুসন্ধান, আন্তঃসংস্থা সমন্বয় এবং জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে সংস্থাটি। একই সঙ্গে সংঘবদ্ধ পাচারকারী চক্রের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণও অব্যাহত রয়েছে। এ ছাড়া ক্রাইম ইনডেক্সে সাড়ে ৬ পয়েন্ট নিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে যৌন অপরাধের উদ্দেশ্যে পাচার। একই সূচক নিয়ে তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও মাদক পাচার। এরপরের অবস্থানে রয়েছে বন্যপ্রাণী চোরা শিকার ও পাচার। এ ধরনের অপরাধের সূচক মান ৫ দশমিক ৫। অস্ত্র চোরাচালানসংক্রান্ত অপরাধের সূচক মান ৫। একই সূচক মান নিয়ে এ তালিকায় রয়েছে বনজ সম্পদ ধ্বংস ও পাচারের জন্য সংঘটিত অপরাধ। এ ছাড়া ভেজাল পণ্য বিক্রির অপরাধের সূচক ৪ দশমিক ৫। একই সূচকে রয়েছে হিরোইনের কারবারসংক্রান্ত অপরাধ এবং অর্থনৈতিক অপরাধ।
আরও পড়ুন
মানব পাচার প্রতিরোধে কাজ করা দেশের বেসরকারি সংস্থা ইনসিডিন বাংলাদেশের প্রোগ্রাম ফোকাল অ্যাডভোকেট রফিকুল ইসলাম খান সময়ের আলোকে বলেন, সরকার মানব পাচার প্রতিরোধের ওপরে জাতীয় কর্মপরিকল্পনায় বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। যেসব ঝুঁকিপূর্ণ পরিবার রয়েছে তাদের সহায়তার জন্য কাজ হচ্ছে। একই সঙ্গে স্থানীয় পর্যায়ে কাউন্টার ট্রাফিকিং কমিটি রয়েছে যারা প্রতিটি ইউনিয়ন, উপজেলা ও জেলায় থাকা মানব পাচার প্রতিরোধে সচেতনতামূলক কার্যক্রম করছে। এ ছাড়া এ বছর মানব পাচার আইনে স্মাগলিংয়ের বিষয়টাও যুক্ত করা হয়েছে বলে জানান এই কর্মকর্তা।
তিনি বলেন, মানব পাচারের ক্ষেত্রে এটা বড় পরিবর্তন। মধ্যপ্রাচ্য থেকে ইউরোপে যাওয়ার পুরো প্রক্রিয়াটা এই স্মাগলিংয়ে অন্তর্ভুক্ত। এটা কোনোভাবেই অ্যাড্রেস করা যাচ্ছিল না। পরে নতুন করে এটাকে ডিফাইন করে আইনে যুক্ত করাটা সুরক্ষার একটা হাতিয়ার হিসেবে সামনে কাজ করবে।
এ ছাড়া মানবাধিকারকর্মী ও অভিবাসন বিশ্লেষকরা বলছেন, শুধু গ্রেফতার বাড়ালেই মানব পাচার কমবে না। সীমান্তবর্তী ও ঝুঁকিপূর্ণ জেলায় বিশেষ নজরদারি বৃদ্ধি, বিদেশে কর্মসংস্থানের নামে প্রতারণাকারী দালালদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক প্রতারণা শনাক্তে সাইবার নজরদারি জোরদার করা, ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ে নিরাপদ অভিবাসন বিষয়ে সচেতনতামূলক প্রচার বাড়ানো এবং উদ্ধার হওয়া নারী ভিকটিমদের পুনর্বাসন, আইনি সহায়তা ও মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হবে।
Leave a Reply