স্থানীয় ও সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, এই চোরাচালান নেটওয়ার্কের সঙ্গে হরিপুর এলাকার কয়েকজন চিহ্নিত ব্যক্তির সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। তাদের মধ্যে মঈনুল, ওয়েস, লোকমান ও রুবেলের নাম স্থানীয়দের মুখে বারবার উঠে এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, তারাই সীমান্ত থেকে অবৈধ পণ্য সংগ্রহ, বহন এবং দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহের পুরো কার্যক্রম সমন্বয় করেন।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, অতীতে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তারা তৎকালীন ছাত্রলীগের কয়েকজন প্রভাবশালী নেতার ছত্রচ্ছায়ায় চোরাচালান কার্যক্রম পরিচালনা করতেন। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও চক্রটি সক্রিয় রয়েছে বলে অভিযোগ। স্থানীয়দের দাবি, বর্তমানে তারা বিভিন্ন রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে নিজেদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, সীমান্ত পার হয়ে আসা ভারতীয় জিরা, প্রসাধনী, চকোলেট, মোটরসাইকেলের যন্ত্রাংশ, বিভিন্ন ভোগ্যপণ্য এবং মাদকদ্রব্য প্রথমে হরিপুর এলাকায় মজুত করা হয়। পরে গভীর রাতে ছোট পিকআপ, মিনি ট্রাক, সিএনজিচালিত যানবাহন ও লোকাল পরিবহনের মাধ্যমে সেগুলো সিলেট নগরীতে আনা হয়। এরপর তামাবিল-টিলাগড় সড়ক ব্যবহার করে দেশের বিভিন্ন জেলায় এসব পণ্য পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
স্থানীয় সূত্র জানায়, হরিপুর থেকে ফেঞ্চুগঞ্জ সড়ক, শেরপুর সেতু এলাকা হয়ে নগরীর বিভিন্ন প্রবেশপথ পর্যন্ত চক্রটি একটি সুসংগঠিত পরিবহন নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে। রাতের নির্দিষ্ট সময়ে একাধিক গাড়ি একসঙ্গে চলাচল করে। অনেক ক্ষেত্রে মালবাহী গাড়ির সামনে ও পেছনে মোটরসাইকেল কিংবা প্রাইভেটকার দিয়ে পাহারা দেওয়ারও অভিযোগ রয়েছে, যাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অবস্থান সম্পর্কে আগাম তথ্য পাওয়া যায় এবং প্রয়োজনে রুট পরিবর্তন করা সম্ভব হয়।
টিলাগড় এলাকার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যবসায়ী বলেন, “প্রায় প্রতিরাতেই রাত ২টা থেকে ভোর ৪টার মধ্যে দ্রুতগতিতে একের পর এক পিকআপ ও মিনি ট্রাক চলাচল করতে দেখা যায়। অনেক সময় সামনে-পেছনে মোটরসাইকেল ও প্রাইভেটকার থাকে। বিষয়টি দীর্ঘদিনের হলেও কার্যকরভাবে বন্ধ হচ্ছে না।”
স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, প্রতিটি মালবাহী গাড়ি নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়ার নামে নির্দিষ্ট হারে অর্থ আদায় করা হয়। পরে সেই অর্থ মোবাইল ব্যাংকিংসহ বিভিন্ন ডিজিটাল মাধ্যমে সিন্ডিকেটের মূল হোতাদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়। চোরাচালানের এই অবৈধ অর্থের একটি অংশ বিভিন্ন অসাধু ব্যক্তি ও প্রভাবশালী মহলের কাছে যাচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগ স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
এদিকে, রাজনৈতিক দলের নাম ব্যবহার করে কেউ যেন অবৈধ কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে না পারে, সে বিষয়ে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছেন সিলেট জেলা বিএনপির এক জ্যেষ্ঠ নেতা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, “আমাদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের স্পষ্ট নির্দেশ দলের নাম ব্যবহার করে কোনো ধরনের অপকর্মের সুযোগ নেই। কেউ জড়িত থাকলে তার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। শুধু বাহকদের নয়, চোরাচালানের অর্থদাতা, পৃষ্ঠপোষক ও মূল হোতাদেরও আইনের আওতায় আনতে হবে।”
অভিযোগের বিষয়ে জানতে মঈনুল, ওয়েস, লোকমান ও রুবেলের সঙ্গে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (মিডিয়া) মো. মফিজুল ইসলাম বলেন, “চোরাচালান প্রতিরোধে পুলিশের নিয়মিত অভিযান অব্যাহত রয়েছে। বিভিন্ন সময়ে বিপুল পরিমাণ চোরাচালানি পণ্য জব্দ করা হয়েছে এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। সীমান্ত এলাকা ও মহাসড়কে নজরদারি আরও বাড়ানো হবে। কোনো ব্যক্তি বা চক্র আইনের ঊর্ধ্বে নয়।”
Leave a Reply