ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ক্ষমতায় থাকছেন, নাকি দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক আধিপত্যের অবসান ঘটছে তা নির্ধারণে ভোট দিচ্ছেন দেশটির নাগরিকেরা। গাজায় যুদ্ধ, ফিলিস্তিনিদের বাস্তুচ্যুতি, দুর্নীতির অভিযোগ এবং ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর নিরাপত্তা ব্যর্থতা নিয়ে বিতর্কের মধ্যে অনুষ্ঠিত হচ্ছে এ নির্বাচন। প্রধান দুই রাজনৈতিক শিবিরের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস পাওয়া যাচ্ছে।
মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) ইসরায়েলি পার্লামেন্ট নেসেটের ১২০টি আসনে ভোটগ্রহণ চলছে। দেশটিতে প্রায় ৭৩ লাখ নিবন্ধিত ভোটার রয়েছেন। নির্বাচনের ফলাফলের ওপর নির্ভর করছে নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এবং পরবর্তী সরকার গঠনের সমীকরণ।
ইসরায়েলের নির্বাচনী ব্যবস্থায় ভোটাররা সরাসরি প্রধানমন্ত্রী নির্বাচন করেন না; বরং পছন্দের রাজনৈতিক দলকে ভোট দেন। প্রতিটি দল নির্বাচনের আগে প্রার্থীদের তালিকা প্রকাশ করে। নেসেটে আসন পেতে একটি দলকে অন্তত ৩ দশমিক ২৫ শতাংশ ভোট পেতে হয়। প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে ১২০টি আসন বণ্টন করা হয়। সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন অন্তত ৬১টি আসন।
নেতানিয়াহুর পাশে ডানপন্থী ও ধর্মীয় দলগুলো
বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু তার দল লিকুদকে সঙ্গে নিয়ে কট্টর ডানপন্থী ও ধর্মীয় জাতীয়তাবাদী দলগুলোর জোটের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। এ জোটের গুরুত্বপূর্ণ শরিকদের মধ্যে রয়েছে ইতামার বেন-গভিরের জিউইশ পাওয়ার এবং অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোত্রিচের রিলিজিয়াস জায়োনিজম। এ ছাড়া অতি রক্ষণশীল দল শাস ও ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজমও তার সম্ভাব্য জোটসঙ্গী।
অন্যদিকে নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরাতে একজোট হয়েছে বিরোধী শিবির। এ শিবিরে রয়েছে ইয়াশার, টুগেদার, ইসরায়েল বেইতেনু ও ডেমোক্র্যাটস। তবে বিরোধীরা নির্বাচনে জয়ী হলে কে প্রধানমন্ত্রী হবেন, সে বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো একক প্রার্থীর নাম ঘোষণা করা হয়নি।
সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর সাবেক প্রধান ও ইয়াশারের নেতা গাদি আইজেনকট। এ ছাড়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও টুগেদারের নেতা নাফতালি বেনেট এবং বিরোধী নেতা ইয়ার লাপিদও সরকারপ্রধান হওয়ার দৌড়ে রয়েছেন।
জরিপে এগিয়ে নেই কোনো পক্ষ
আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সের গত শুক্রবারের এক জরিপ অনুযায়ী, লিকুদ ও ইয়াশার ২২টি করে আসন পেতে পারে। টুগেদার পেতে পারে ১৪টি আসন। ডেমোক্র্যাটস ও জয়েন্ট লিস্টের প্রত্যেকের আসনসংখ্যা হতে পারে ৯টি।
জরিপে জিউইশ পাওয়ার, শাস ও ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজমের প্রত্যেকের ৮টি করে আসন পাওয়ার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। ইসরায়েল বেইতেনু ও রিলিজিয়াস জায়োনিজম পেতে পারে ৭টি করে আসন। আর রা’আমের সম্ভাব্য আসনসংখ্যা ৫টি।
এই হিসাব অনুযায়ী, নেতানিয়াহুর ডানপন্থী জোট পেতে পারে ৫৩টি আসন। অন্যদিকে বিরোধী শিবিরের আসনসংখ্যা হতে পারে ৫২। ফলে কোনো পক্ষেরই এককভাবে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ৬১টি আসন পাওয়ার সম্ভাবনা স্পষ্ট নয়।
এ পরিস্থিতিতে ইসরায়েলি ফিলিস্তিনি নাগরিকদের প্রতিনিধিত্বকারী আরব দলগুলোর সমর্থন সরকার গঠনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। তবে বিরোধী নেতা গাদি আইজেনকটসহ কয়েকজন শীর্ষ নেতা আরব দলগুলোর সঙ্গে সরকার গঠনের বিষয়ে অনাগ্রহ প্রকাশ করেছেন।
ফলে রাজনৈতিক সমঝোতা না হলে আবারও নির্বাচন আয়োজনের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। সে ক্ষেত্রে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়া পর্যন্ত নেতানিয়াহু তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে পারেন। নির্বাচনে জয়ী হলে এটি হবে তার সপ্তম মেয়াদে সরকারপ্রধান হওয়ার সুযোগ।
নিরাপত্তা ব্যর্থতা ও গাজা যুদ্ধের প্রভাব
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নজিরবিহীন হামলার পর এটিই ইসরায়েলের প্রথম নির্বাচন। ওই হামলা ঠেকাতে ব্যর্থ হওয়া, গোয়েন্দা ত্রুটি এবং নিরাপত্তাব্যবস্থার দুর্বলতা নির্বাচনী প্রচারের গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছে।
নিরাপত্তা ব্যর্থতার দায় নিতে সরাসরি অস্বীকৃতি জানিয়েছেন নেতানিয়াহু। অন্যদিকে বিরোধীরা এ বিষয়ে কঠোর জবাবদিহি এবং স্বাধীন তদন্তের দাবি তুলেছেন।
এ ছাড়া অতি রক্ষণশীল ইহুদি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের বাধ্যতামূলক সামরিক সেবা থেকে অব্যাহতি এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় ধর্মের ভূমিকা নিয়েও জনমনে অসন্তোষ রয়েছে।
গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান, ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ ও ফিলিস্তিনিদের বাস্তুচ্যুতির বিষয়টিও নির্বাচন ঘিরে আলোচনায় রয়েছে।
গাজার বাস্তুচ্যুত নাগরিক মোহাম্মদ ইলিয়ানের ভাষ্য, নেতানিয়াহু নির্বাচনে পরাজিত হলেও ফিলিস্তিনের বিষয়ে ইসরায়েলের নীতিতে বড় পরিবর্তন নাও আসতে পারে। তবে তার পরাজয় দেখতে পারাটাই ফিলিস্তিনিদের জন্য সন্তুষ্টির বিষয় হবে বলে তিনি আলজাজিরাকে জানিয়েছেন।