পারভেজ আহমদ:::
ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে যাওয়ার প্রবণতা কমলেও ঝুঁকিপূর্ণ এই পথে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের যাত্রা থেমে নেই। চলতি ২০২৬ সালের প্রথম নয় মাসে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সীমান্তে অবৈধ প্রবেশের ঘটনা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কমেছে। তবে ভূমধ্যসাগর হয়ে ইউরোপে পৌঁছানোর চেষ্টাকারীদের মধ্যে বাংলাদেশিরা অন্যতম প্রধান জনগোষ্ঠী হিসেবে রয়েছেন।
ইউরোপীয় সীমান্ত ও উপকূলরক্ষী সংস্থা ফ্রন্টেক্সের অক্টোবরের প্রতিবেদনের বরাতে দেওয়া তথ্যে এসব চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ইউরোপীয় ইউনিয়নের সীমান্তে ৯১ হাজারের বেশি অনিয়মিত প্রবেশ শনাক্ত হয়েছে। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় এ সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কম।
তবে সামগ্রিকভাবে অভিবাসন কমলেও ভূমধ্যসাগরের পূর্ব ও মধ্যাঞ্চল দিয়ে ইউরোপে প্রবেশের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। বিশেষ করে ইতালি ও গ্রিসমুখী সমুদ্রপথে বাংলাদেশিসহ বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের উপস্থিতি বেশি দেখা যাচ্ছে। এসব যাত্রার বড় অংশই হচ্ছে ছোট নৌকায়, যেখানে অতিরিক্ত যাত্রী বহন এবং পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থার অভাবে প্রাণহানির ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় পথে ৩১ হাজার ৮০০ প্রবেশ শনাক্ত
ফ্রন্টেক্সের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় পথে প্রায় ৩১ হাজার ৮০০ জনের অনিয়মিত প্রবেশ শনাক্ত হয়েছে। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় এ সংখ্যা ১৫ শতাংশ কম।
এ পথে শনাক্ত হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে সুদানি, বাংলাদেশি ও আফগান নাগরিকদের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি রয়েছে। এ রুটে লিবিয়া থেকে গ্রিসের ক্রিট দ্বীপের দিকে সমুদ্রযাত্রা যেমন রয়েছে, তেমনি তুরস্কের সঙ্গে স্থলসীমান্ত দিয়েও ইউরোপে প্রবেশের চেষ্টা করেন অনেকে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর মাসেই এ পথে প্রায় ৪ হাজার ৮০০ জনের অনিয়মিত প্রবেশ শনাক্ত হয়েছে। ফলে সামগ্রিক প্রবণতা নিম্নমুখী হলেও পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় রুটে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের চলাচল পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।
মধ্য ভূমধ্যসাগরীয় পথে বাংলাদেশিদের উপস্থিতি বেশি
বাংলাদেশিদের উপস্থিতির ক্ষেত্রে মধ্য ভূমধ্যসাগরীয় পথ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ফ্রন্টেক্সের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম নয় মাসে এ পথে প্রায় ২২ হাজার ৫০০ জনের অনিয়মিত প্রবেশ শনাক্ত হয়েছে। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় এ সংখ্যা ৫৬ শতাংশ কম।
তবে এ পথে আগত অভিবাসীদের মধ্যে বাংলাদেশি, আলজেরীয় ও সোমালি নাগরিকদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। সাধারণত লিবিয়া থেকে সমুদ্রপথে যাত্রা করে ইতালিসহ ইউরোপের বিভিন্ন গন্তব্যে পৌঁছানোর চেষ্টা করেন অভিবাসনপ্রত্যাশীরা।
এ রুটে যাত্রাকারীদের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ লিবিয়া থেকে যাত্রা শুরু করেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি তিউনিসিয়া ও আলজেরিয়া থেকেও অনেকে সমুদ্রপথে ইউরোপের উদ্দেশে রওনা হন।
বাংলাদেশিদের এই পথে যাত্রার পেছনে কাজ, উন্নত জীবনযাপন এবং অর্থনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার প্রত্যাশা থাকতে পারে। তবে প্রত্যেক অভিবাসনপ্রত্যাশীর যাত্রার কারণ এক নয়। অনেকেই বিদেশে কাজের সুযোগের আশায় দালাল বা মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে যাত্রার ব্যবস্থা করেন। এ ক্ষেত্রে বৈধ কাগজপত্র, ভিসা এবং গন্তব্য দেশের অভিবাসন আইন সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা না থাকলে প্রতারণার ঝুঁকি বাড়ে।
কমেছে প্রবেশ, কিন্তু কমেনি মৃত্যুঝুঁকি
ইউরোপে অনিয়মিত প্রবেশের সংখ্যা কমলেও ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেওয়ার ঝুঁকি কমেনি। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ভূমধ্যসাগরে প্রায় দুই হাজার মানুষের প্রাণহানির তথ্য পাওয়া গেছে বলে দেওয়া তথ্যে উল্লেখ রয়েছে। প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে, কারণ সমুদ্রে নিখোঁজ হওয়া অনেক মানুষের বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায় না।
ঝুঁকিপূর্ণ এই যাত্রায় সবচেয়ে বড় বিপদের কারণ হলো অনিরাপদ নৌযান, অতিরিক্ত যাত্রী বহন, পর্যাপ্ত জীবনরক্ষাকারী সরঞ্জামের অভাব এবং বৈরী আবহাওয়া। অনেক ক্ষেত্রে ছোট নৌকায় ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি মানুষ তোলা হয়। মাঝসমুদ্রে নৌযানে ত্রুটি দেখা দিলে কিংবা উত্তাল ঢেউয়ের মুখে পড়লে যাত্রীদের জীবন রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়ে।
এ ছাড়া মানবপাচারকারী চক্রের প্রতারণা অভিবাসনপ্রত্যাশীদের বিপদ আরও বাড়িয়ে তোলে। ইউরোপে পৌঁছে দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে বিপুল অর্থ নেওয়া, যাত্রাপথে অতিরিক্ত টাকা দাবি এবং অনিরাপদ নৌযানে তুলে দেওয়ার মতো অভিযোগ বিভিন্ন অভিবাসন রুটে দীর্ঘদিন ধরে রয়েছে।
অনেক সময় অনুকূল আবহাওয়ার অপেক্ষায় অভিবাসনপ্রত্যাশীদের দীর্ঘদিন আটকে রাখা হয়। এ সুযোগে তাদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের ঘটনাও ঘটতে পারে। ফলে ইউরোপে পৌঁছানোর স্বপ্ন নিয়ে যাত্রা শুরু করলেও অনেকের জন্য এ যাত্রা হয়ে ওঠে অনিশ্চয়তা, প্রতারণা ও প্রাণহানির কারণ।
মানবপাচারকারী চক্র নিয়ে সতর্কবার্তা
ফ্রন্টেক্সের নির্বাহী পরিচালক হ্যান্স লেইটেনসের বক্তব্য অনুযায়ী, ইউরোপে প্রবেশের অধিকাংশ অনিয়মিত পথের প্রবণতা কমলেও পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তিত হতে পারে। মানবপাচারকারী চক্রগুলোর তৎপরতা কমে যাওয়া মানেই তাদের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়া নয়; বরং সুযোগ বুঝে তারা আবারও সক্রিয় হতে পারে।
এ কারণে ইউরোপমুখী অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে সীমান্ত নজরদারির পাশাপাশি মানবপাচারকারী চক্রের অর্থায়ন, যোগাযোগব্যবস্থা এবং অবৈধ পরিবহন নেটওয়ার্ক শনাক্ত করা গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের সচেতনতা বাড়ানো, বৈধ অভিবাসনের সুযোগ সম্প্রসারণ এবং বিদেশে কর্মসংস্থানের নির্ভরযোগ্য তথ্য নিশ্চিত করাও প্রয়োজন।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এ বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। কারণ বিদেশে কাজের সুযোগের আশায় অনেক মানুষ নিজেদের সঞ্চয়, জমিজমা কিংবা পরিবারের সম্পদ বিক্রি করে দালালদের হাতে অর্থ তুলে দেন। প্রতিশ্রুত গন্তব্যে পৌঁছাতে ব্যর্থ হলে তাঁদের আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি শারীরিক নিরাপত্তাও হুমকির মুখে পড়ে।
নতুন অভিবাসন নীতি, বাড়ছে পরিচয় যাচাই
ইউরোপীয় ইউনিয়নের নতুন অভিবাসন ও আশ্রয়ব্যবস্থার আওতায় সীমান্তে আগত ব্যক্তিদের পরিচয় যাচাই, বায়োমেট্রিক তথ্য সংগ্রহ এবং জাতীয়তা নির্ধারণের প্রক্রিয়ায় গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এসব ব্যবস্থার উদ্দেশ্য হলো সীমান্ত ব্যবস্থাপনা আরও সমন্বিত করা এবং আশ্রয়প্রার্থীদের আবেদন নির্ধারিত নিয়মে পর্যালোচনা করা।
ফ্রন্টেক্সের কর্মকর্তারা সদস্যদেশগুলোকে সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও পরিচয় যাচাইয়ের কাজে সহায়তা করেন। সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়ায় কারও আশ্রয়ের আবেদন প্রত্যাখ্যাত হলে এবং ফেরত পাঠানোর আইনগত সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে তাঁকে নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।
প্রদত্ত তথ্যে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে প্রায় ৫৪ বাংলাদেশিকে গ্রিস ও ইতালি থেকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে। তবে তাঁদের ফেরত পাঠানোর তারিখ, আইনি প্রক্রিয়া এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বিবরণ প্রকাশের আগে যাচাই করা প্রয়োজন।
বৈধ পথে অভিবাসনের ওপর গুরুত্ব
বিশেষজ্ঞদের মতে, অনিয়মিত ও ঝুঁকিপূর্ণ পথে ইউরোপে যাওয়ার প্রবণতা কমাতে শুধু সীমান্তে নজরদারি বাড়ানো যথেষ্ট নয়। এর পাশাপাশি বৈধ কর্মসংস্থানের সুযোগ, বিদেশে চাকরির নির্ভরযোগ্য তথ্য, দক্ষতা উন্নয়ন এবং মানবপাচারবিরোধী কার্যক্রম জোরদার করা প্রয়োজন।
অভিবাসনপ্রত্যাশীদেরও বিদেশে যাওয়ার আগে ভিসা, চাকরির চুক্তি, নিয়োগদাতার পরিচয় এবং সংশ্লিষ্ট দেশের আইন সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া জরুরি। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান ইউরোপে পৌঁছে দেওয়ার নিশ্চয়তা দিয়ে বিপুল অর্থ দাবি করলে তা যাচাই না করে অর্থ দেওয়া বিপজ্জনক হতে পারে।
ভূমধ্যসাগর দিয়ে ইউরোপে প্রবেশের সংখ্যা কমে আসা অভিবাসন নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন। কিন্তু বাংলাদেশিদের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি এবং সমুদ্রপথে প্রাণহানির ঝুঁকি দেখিয়ে দিচ্ছে, নিরাপদ ও বৈধ অভিবাসনের সুযোগ নিশ্চিত করা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রা ও মানবপাচার থেকে মানুষকে রক্ষা করতে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সমন্বিত উদ্যোগের পাশাপাশি বাংলাদেশেও সচেতনতা ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা জোরদার করা প্রয়োজন।