জৈন্তাপুর প্রতিনিধি:::
সিলেটের সীমান্তবর্তী উপজেলা জৈন্তাপুরে মাদক, চোরাচালান, মানবপাচার ও অপরাধ নিয়ন্ত্রণে ধারাবাহিক অভিযান পরিচালনা করছে জৈন্তাপুর মডেল থানা পুলিশ। থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান মোল্লার নেতৃত্ব ও সার্বিক তদারকিতে সেপ্টেম্বরের শেষ দিন থেকে অক্টোবর মাসজুড়ে এবং নভেম্বরের প্রথম পাঁচ দিনে এসব অভিযান পরিচালিত হয়। এসব অভিযানে বিপুল পরিমাণ ভারতীয় চোরাচালানি পণ্য, বিদেশি মদ, ফেনসিডিল ও ইয়াবা জব্দসহ একাধিক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ৩০ সেপ্টেম্বর থেকে অক্টোবর মাসের শেষ পর্যন্ত পরিচালিত বিভিন্ন অভিযানে প্রায় ১ কোটি ৭৭ লাখ ৭১ হাজার টাকার অবৈধ মালামাল ও সংশ্লিষ্ট আলামত জব্দ করা হয়েছে। অন্যদিকে নভেম্বরের ৩ ও ৫ তারিখে পৃথক দুটি অভিযানে আরও ৩ লাখ ৩৮ হাজার টাকা মূল্যের ভারতীয় মদ ও ইয়াবা উদ্ধার করা হয়। এসব অভিযানে বিভিন্ন মামলায় মোট ১৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
বিশেষ করে তামাবিল মহাসড়ক, হরিপুর পুলিশ চেকপোস্ট, দরবস্ত, নিজপাট ও উপজেলার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় নিয়মিত তল্লাশি এবং গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান পরিচালনা করছে পুলিশ। মাদক ও চোরাচালান প্রতিরোধের পাশাপাশি মানবপাচার মামলার আসামি গ্রেপ্তার এবং শারদীয় দুর্গাপূজায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেও সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে থানা পুলিশ।
তারিখ অনুযায়ী পুলিশের অভিযানের চিত্র:
৩০ সেপ্টেম্বর: বালুবাহী ট্রাক থেকে ১ কোটি ৩৫ লাখ টাকার শাড়ি জব্দ
৩০ সেপ্টেম্বর ভোর সাড়ে ৫টার দিকে তামাবিল মহাসড়কের সারিঘাট এলাকায় বালুবাহী ট্রাকে অভিযান চালিয়ে ৪ হাজার ৩৪১ পিস ভারতীয় শাড়ি জব্দ করে পুলিশ। বালুর নিচে কৌশলে লুকিয়ে এসব শাড়ি পাচার করা হচ্ছিল। জব্দ করা শাড়ির আনুমানিক বাজারমূল্য ১ কোটি ৩৫ লাখ টাকা। এ ঘটনায় মো. আলালকে আটক করা হয়। তিনি গোয়াইনঘাট উপজেলার আলীরগাঁও ইউনিয়নের পাঁচ সেউতি এলাকার বাসিন্দা। এ ঘটনায় বিশেষ ক্ষমতা আইনে মামলা দায়ের করা হয়।
৩ অক্টোবর: দুর্গাপূজার নিরাপত্তায় মতবিনিময় সভা
আসন্ন শারদীয় দুর্গাপূজা শান্তিপূর্ণভাবে উদযাপনের লক্ষ্যে জৈন্তাপুর মডেল থানায় সনাতন ধর্মাবলম্বীদের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে মতবিনিময় সভা করেন ওসি মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান মোল্লা। উপজেলার ২০টি পূজামণ্ডপের নিরাপত্তা, সিসি ক্যামেরা সচল রাখা, পুলিশের নিয়মিত টহল ও সার্বক্ষণিক নজরদারিসহ বিভিন্ন বিষয়ে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়। প্রতিটি পূজামণ্ডপে পুলিশি নিরাপত্তা ও বিশেষ টিমের মাধ্যমে নিয়মিত নজরদারির আশ্বাস দেওয়া হয়।
৯ অক্টোবর: চেকপোস্টে ৮৫টি ভারতীয় কম্বল জব্দ, আটক ২
রাত সাড়ে ৮টার দিকে নিজপাট ইউনিয়নের মাস্তিংহাটি এলাকায় জৈন্তাপুর মডেল থানার সামনে চেকপোস্ট স্থাপন করে ‘নিউ স্পেশাল’ নামের একটি যাত্রীবাহী বাস থেকে ৮৫টি ভারতীয় কম্বল জব্দ করে পুলিশ। এ ঘটনায় গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার সিংজানি গ্রামের আতিক হাসান লাজু (৩২) এবং খুলনার পাইকগাছা উপজেলার আলমতলা গ্রামের আলঙ্গীর কবির (৩৩) নামে দুজনকে আটক করা হয়। কম্বলগুলোর আর্থিক মূল্য সংশ্লিষ্ট তথ্যে উল্লেখ করা হয়নি।
১৭ অক্টোবর: ট্রাক থেকে মদ, ফেনসিডিল ও ইয়াবা জব্দ, আটক ৩
দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে তামাবিল মহাসড়কের হরিপুর পুলিশ চেকপোস্টে সিলেটগামী একটি ট্রাকে তল্লাশি চালিয়ে ৬৪৮ বোতল বিদেশি মদ, ৪০ বোতল ফেনসিডিল ও ৪০০ পিস ইয়াবা জব্দ করে পুলিশ। ট্রাকের ওপর কলাপাতার নিচে কৌশলে এসব মাদকদ্রব্য লুকিয়ে পরিবহন করা হচ্ছিল। জব্দ করা মাদকদ্রব্যের আনুমানিক বাজারমূল্য ৮ লাখ ৮৮ হাজার টাকা। এ ছাড়া মাদক পরিবহনে ব্যবহৃত ট্রাকটির মূল্য আনুমানিক ২৮ লাখ টাকা এবং নগদ ১০ হাজার টাকা জব্দ করা হয়। সব মিলিয়ে জব্দকৃত আলামতের মূল্য প্রায় ৩৭ লাখ টাকা।
এ ঘটনায় নওগাঁর পোরশা উপজেলার শিষাবাজার এলাকার মো. সিরাজ (২৪), পত্নীতলা উপজেলার কাশিপুর এলাকার মো. রমজান হোসেন তামিম (২৪) এবং মহাদেবপুর উপজেলার এনায়েতপুর এলাকার মো. ইদ্রিস আলী (৩৮) আটক হন।
১৮ অক্টোবর: সিএনজির বনেট থেকে ৯৬ বোতল বিদেশি মদ উদ্ধার
ভোর ৪টা ১০ মিনিটের দিকে শাপলা ফিলিং স্টেশনের সামনে অভিযান চালিয়ে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশার বনেট থেকে ৯৬ বোতল বিদেশি মদ উদ্ধার করে পুলিশ। উদ্ধার করা মদের আনুমানিক বাজারমূল্য ২ লাখ ৩৬ হাজার টাকা। এ ঘটনায় অটোরিকশার চালক নুরুল ইসলাম আকাশ (২৭) গ্রেপ্তার হন। তিনি সিলেটের এয়ারপোর্ট থানাধীন লীলাপাড়া ছড়ারপাড় এলাকার বাসিন্দা।
২৫ অক্টোবর: বাস থেকে ৩ লাখ ৩৭ হাজার টাকার ভারতীয় পণ্য জব্দ, গ্রেপ্তার ৩
সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে হরিপুর পুলিশ চেকপোস্টে ‘ঢাকা এক্সপ্রেস’ নামের ঢাকাগামী একটি বাসে তল্লাশি চালিয়ে বিপুল পরিমাণ ভারতীয় পণ্য জব্দ করে পুলিশ। জব্দ করা পণ্যের মধ্যে ছিল ২০টি ভারতীয় কম্বল, ১০ হাজার ১২৮ প্যাকেট ওরিও বিস্কুট, ১ হাজার ৩৬০ বোতল পেপার বোট সুইং কোকোনাট ওয়াটার, ৭০০ বোতল আমুল কুল, ৯৫ প্যাকেট কাভেরি মেহেদি কোন, ২০৪ প্যাকেট সোন পাপড়ি, ২১০ বোতল ক্লিনিক প্লাস শ্যাম্পু এবং ২ হাজার ১৫০ পিস সাফারি চকলেট। জব্দ করা পণ্যের আনুমানিক মূল্য ৩ লাখ ৩৭ হাজার টাকা।
এ ঘটনায় জামালপুরের ইসলামপুর উপজেলার গাওকুড়া গ্রামের মো. জুয়েল আহম্মেদ (৩১), ঢাকার পল্লবী এলাকার মো. এনামুল হক (৪২) এবং শেরপুরের বালুরঘাট হেরুয়া এলাকার মো. ইমরান হোসাইন (২৬) গ্রেপ্তার হন।
২৯ অক্টোবর: মানবপাচার মামলার এজাহারনামীয় আসামি গ্রেপ্তার
রাত ৯টা ৫০ মিনিটের দিকে জৈন্তাপুরের আলুবাগান এলাকা থেকে দুই নারীকে উচ্চ বেতনের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে ভারতে পাচারের চেষ্টার অভিযোগে দায়ের করা মামলার এজাহারনামীয় আসামি হানিফ মিয়া (৩৫) গ্রেপ্তার হন। তিনি উপজেলার ডিবির হাওর গ্রামের মৃত ছায়েদ আলীর ছেলে।
জৈন্তাপুর মডেল থানার ওসি মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান মোল্লা গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, হানিফ মিয়ার বিরুদ্ধে ইতিপূর্বে মানবপাচার সংক্রান্ত আরও পাঁচটি মামলা রয়েছে। সীমান্ত এলাকায় মানবপাচার প্রতিরোধে পুলিশের জিরো টলারেন্স নীতি অব্যাহত থাকবে বলেও জানান তিনি।
৩ নভেম্বর: সিএনজির বনেট থেকে ৬৮ বোতল ভারতীয় মদ উদ্ধার, আটক ৩
নভেম্বরের প্রথম দিকেও পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। ৩ নভেম্বর রাত ৮টা ৩০ মিনিটের দিকে উপজেলার দরবস্ত বাজারে পিউরিয়া মিষ্টির দোকানের সামনে অভিযান চালিয়ে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশার পেছনের বনেট থেকে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের ৬৮ বোতল ভারতীয় মদ উদ্ধার করে পুলিশ। উদ্ধার করা মদের আনুমানিক বাজারমূল্য ১ লাখ ৮৬ হাজার টাকা।
এ ঘটনায় অটোরিকশায় থাকা সিলেটের শাহপরান থানাধীন পীরের বাজারের উত্তর মুকামেরগুল এলাকার রবিউল মিয়া (২৬), সালমান আহমদ (২০) ও রাহাত আহমদ (২১) আটক হন। জৈন্তাপুর মডেল থানার ওসি মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান মোল্লা জানান, তাঁদের বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে।
৫ নভেম্বর: রুপচেংয়ে ৩৮০ পিস ইয়াবাসহ যুবক গ্রেপ্তার
৫ নভেম্বর সকাল সাড়ে ১০টার দিকে উপজেলার রুপচেং এলাকায় গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে ৩৮০ পিস ইয়াবা ট্যাবলেটসহ মো. রুমিন আহমদ (৩৩) নামে এক যুবককে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। উদ্ধার করা ইয়াবার আনুমানিক বাজারমূল্য ১ লাখ ৫২ হাজার টাকা। রুমিন আহমদ উপজেলার পাখিবিল গ্রামের আজিজুল হকের ছেলে।
জৈন্তাপুর মডেল থানার এসআই শওকত মাসুদের নেতৃত্বে পুলিশের একটি দল এ অভিযান পরিচালনা করে। এ ঘটনায় তাঁর বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা দায়ের করা হয়েছে।
সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর: উদ্ধারকৃত মালামালের আর্থিক হিসাব
পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ৩০ সেপ্টেম্বর থেকে অক্টোবর মাসের শেষ পর্যন্ত যেসব অভিযানে মালামালের মূল্য উল্লেখ করা হয়েছে, তার হিসাব হলো
– ৩০ সেপ্টেম্বর ভারতীয় শাড়ি: ১ কোটি ৩৫ লাখ টাকা।
– ১৭ অক্টোবর মাদক, ট্রাক ও নগদ অর্থসহ: প্রায় ৩৬ লাখ ৯৮ হাজার টাকা।
– ১৮ অক্টোবর বিদেশি মদ: ২ লাখ ৩৬ হাজার টাকা।
– ২৫ অক্টোবর ভারতীয় পণ্য: ৩ লাখ ৩৭ হাজার টাকা।
সব মিলিয়ে সেপ্টেম্বরের শেষ দিন থেকে অক্টোবর মাস পর্যন্ত প্রায় ১ কোটি ৭৭ লাখ ৭১ হাজার টাকার অবৈধ মালামাল ও সংশ্লিষ্ট আলামত জব্দ করা হয়েছে।
অন্যদিকে নভেম্বরের প্রথম দুই অভিযানে
– ৩ নভেম্বর ভারতীয় মদ: ১ লাখ ৮৬ হাজার টাকা।
– ৫ নভেম্বর ইয়াবা: ১ লাখ ৫২ হাজার টাকা।
সব মিলিয়ে নভেম্বরের ওই দুই অভিযানে ৩ লাখ ৩৮ হাজার টাকার মাদক উদ্ধার করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, ৯ অক্টোবরের ৮৫টি ভারতীয় কম্বলের আর্থিক মূল্য উল্লেখ না থাকায় তা হিসাবের বাইরে রাখা হয়েছে। ১৭ অক্টোবরের হিসাবে মাদকদ্রব্যের পাশাপাশি জব্দ করা ট্রাক ও নগদ অর্থের মূল্যও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
অপরাধ দমনে ওসির নেতৃত্ব ও তদারকি
জৈন্তাপুরের মতো সীমান্তবর্তী গুরুত্বপূর্ণ উপজেলায় মাদক, চোরাচালান ও মানবপাচার প্রতিরোধে পুলিশের এ ধারাবাহিক অভিযান আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় থানা পুলিশের সক্রিয়তার চিত্র তুলে ধরছে। বিশেষ করে তামাবিল মহাসড়ক ও হরিপুর চেকপোস্টে নিয়মিত তল্লাশি, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান এবং অপরাধীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার কার্যক্রমে ওসি মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান মোল্লার নেতৃত্ব ও সার্বিক তদারকি রয়েছে।
অভিযান পরিচালনায় এসআই শওকত মাসুদ, এসআই উৎসব কর্মকারসহ থানার বিভিন্ন পর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তারা দায়িত্ব পালন করছেন। মাদক ও চোরাচালান প্রতিরোধের পাশাপাশি ধর্মীয় উৎসবের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং মানবপাচারের মতো গুরুতর অপরাধের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণেও পুলিশের তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে।
জৈন্তাপুর মডেল থানা পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, মাদক, চোরাচালান, মানবপাচার ও অন্যান্য অপরাধের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত থাকবে। অপরাধ দমনে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না। পাশাপাশি অপরাধ ও অপরাধীদের বিষয়ে তথ্য দিয়ে পুলিশকে সহযোগিতা করার জন্য স্থানীয় জনগণের প্রতিও আহ্বান জানানো হয়েছে।
সীমান্তবর্তী এ জনপদে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পুলিশের এমন ধারাবাহিক অভিযান আগামী দিনেও অব্যাহত থাকবে বলে প্রত্যাশা স্থানীয়দের।