এনআইডি সংশোধন ও নতুন ভোটার নিবন্ধনে হয়রানি, ফাইল আটকে অর্থ আদায়ের অভিযোগ; আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা আলাউদ্দীনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন
জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) সংশোধন, নতুন ভোটার নিবন্ধন কিংবা তথ্য হালনাগাদ সব প্রক্রিয়ার জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিয়েও মিলছে না কাঙ্ক্ষিত সেবা। দিনের পর দিন, এমনকি মাসের পর মাস ঘুরেও সমাধান পাচ্ছেন না সাধারণ মানুষ। অভিযোগ রয়েছে, অতিরিক্ত টাকা না দিলে আটকে থাকে ফাইল, আর অর্থের বিনিময়ে দ্রুত সম্পন্ন হচ্ছে জটিল কাজ। সিলেট আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তার কার্যালয়ে নাগরিক সেবার আড়ালে এমন ঘুষ-বাণিজ্য, দালালচক্রের দৌরাত্ম্য ও অনিয়মের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয় সূত্র ও ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, এ অনিয়মের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন বিভাগীয় নির্বাচন অফিস, সিলেটের ডাটা এন্ট্রি অপারেটর মো. হাসান আহমদ। তাঁকে ঘিরেই অফিসের ভেতরে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট গড়ে ওঠার অভিযোগ রয়েছে। এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে সেবাপ্রত্যাশীদের ফাইল আটকে রাখা, দ্রুত কাজ করে দেওয়ার নামে অতিরিক্ত অর্থ দাবি এবং অনৈতিক লেনদেনের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে বলে অভিযোগকারীদের দাবি।
শুধু একজন কর্মচারীকে ঘিরেই নয়, পুরো অফিসের প্রশাসনিক তদারকি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা মো. আলাউদ্দীনের ভূমিকা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ভুক্তভোগীরা। তাঁদের অভিযোগ, অফিসের অভ্যন্তরে দীর্ঘদিন ধরে এমন অনিয়ম চললেও কার্যকর পদক্ষেপের অভাব রয়েছে। প্রশাসনিক নজরদারির দুর্বলতা কিংবা দায়িত্বশীলদের নিষ্ক্রিয়তার সুযোগে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি অংশ এবং বাইরের দালালচক্র আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।
উল্লেখ্য, গত ৩ সেপ্টেম্বর সিলেট আঞ্চলিক নির্বাচন অফিসের নাগরিক সেবার অনিয়ম ও ভোগান্তি নিয়ে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছিল। কিন্তু এরপরও পরিস্থিতির দৃশ্যমান কোনো পরিবর্তন হয়নি বলে অভিযোগ সেবাপ্রত্যাশীদের। বরং নতুন করে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ সামনে আসায় ক্ষোভ আরও বেড়েছে।
ভুক্তভোগীদের ভাষ্য, নিয়ম অনুযায়ী প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেওয়ার পরও সংশ্লিষ্ট ফাইল দিনের পর দিন পড়ে থাকে। কখনো ত্রুটি, কখনো যাচাই-বাছাইয়ের অজুহাতে ঝুলিয়ে রাখা হয় আবেদন। অথচ দালালচক্রের মাধ্যমে যোগাযোগ কিংবা নির্দিষ্ট অঙ্কের অতিরিক্ত অর্থের সমঝোতা হলে দ্রুতই সম্পন্ন হচ্ছে একই কাজ। ফলে সরকারি নিয়মে সেবা নিতে এসে অনেকেই শেষ পর্যন্ত অনৈতিক অর্থ দিতে বাধ্য হচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়ছেন সিলেট অঞ্চলের প্রবাসীরা। স্বল্প সময়ের জন্য দেশে এসে এনআইডি সংশোধন কিংবা প্রয়োজনীয় তথ্য হালনাগাদের আবেদন করলেও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সেবা পাচ্ছেন না তাঁরা। দেশে অবস্থানের সময় শেষ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় অনেক প্রবাসী বাধ্য হয়ে দালালচক্রের দ্বারস্থ হচ্ছেন এবং বাড়তি অর্থ খরচ করছেন।
এ অবস্থায় সিলেটের সচেতন নাগরিক ও ভুক্তভোগীরা নির্বাচন কমিশনের প্রধান কার্যালয়ের জরুরি হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন। তাঁদের দাবি, অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে অবিলম্বে একটি নিরপেক্ষ উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করতে হবে। একই সঙ্গে কোন ফাইল কত দিন ধরে আটকে রয়েছে, কার মাধ্যমে ফাইল নিষ্পত্তি হচ্ছে, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে ওঠা অনৈতিক অর্থ লেনদেনের অভিযোগ এবং অফিসকেন্দ্রিক দালালচক্রের কার্যক্রম তদন্তের আওতায় আনতে হবে।
তাঁরা আরও বলেন, অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ জড়িত সবার বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। নাগরিকের সাংবিধানিক পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ দলিল এনআইডি পেতে কাউকে যেন ঘুষ, দালালি কিংবা হয়রানির শিকার হতে না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে।