পবিত্র ঈদুল আজহার বাকি আর মাত্র ৩ দিন। রাজধানীর ডিএনসিসি ও ডিএসসিসির নিয়ন্ত্রণে ২৭টি স্থানে কুরবানির পশুর হাট জমে উঠছে। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে নদীপথে ট্রলারে ট্রলারে ও ট্রাকে ট্রাকে গরু এসে পৌঁছাচ্ছে ঢাকার হাটগুলোতে। তবে হাটে গরু বাড়লেও ক্রেতার সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম। তারপরও এবার বিদেশি গরু না থাকায় ভালো দাম পাওয়ার আশায় রয়েছেন ব্যবসায়ী ও খামারিরা।
এবার দেশীয় খামারের পশুর সরবরাহ ভালো হওয়ায় সংকটের আশঙ্কা নেই। বরং পর্যাপ্ত পশু থাকায় শেষ সময়ে দাম কিছুটা সহনীয় থাকতে পারে। ব্যবসায়ীরা ২ থেকে ৫ লাখ টাকার মধ্যে বড় গরু আনলেও বেশিরভাগ ক্রেতার আগ্রহ ৮০ হাজার থেকে দেড় বা দুই লাখ টাকার গরুতে। ক্রেতারা ৮০ হাজার বললেও লাখের নিচে কোনও গরু নেই।
রাজধানীর অন্যতম বড় পশুর হাট আফতাবনগরে দেখা যায়, খামারি ও ব্যবসায়ীরা যেসব গরু নিয়ে বসেছেন, এর দাম লাখের নিচে নেই। দুই থেকে আড়াই মণ ওজনের গরু ১ লাখ ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা, আড়াই থেকে চার মণের গরুর দাম দেড় থেকে দুই লাখ টাকা, ৪ থেকে ৬ মণের গরুর দাম ২ লাখ ২০ হাজার থেকে ২ লাখ ৮০ হাজার টাকা আর ৬ মণের বেশি ওজনের গরু ৩ লাখ টাকার বেশি দাম চাচ্ছেন বেপারিরা।
ব্যবসায়ী ও খামারিরা বলছেন, এখন পর্যন্ত ৫০ শতাংশ গরু এসেছে। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে প্রতিদিন গরু আসছে। আফতাবনগর হাটে চারটি গরু নিয়ে মেহেরপুর থেকে এসেছেন ব্যবসায়ী বোরহান উদ্দিন।
তিনি বলেন, প্রতি বছরই আমি ঢাকার বিভিন্ন হাটে গরু নিয়ে আসি। এবার আশা করছি জোড়া ৪ লাখ করে বিক্রি করতে পারব। আগের চেয়ে গরু পালন করতে অনেক বেশি খরচ হচ্ছে। এর কমে বিক্রি করলে লস হবে। কিন্তু ক্রেতারা দাম খুব কম বলছেন।
চাঁদপুর থেকে ৩৯টি গরু নিয়ে হাটে আসা আখতার হোসেন বলেন, গৃহস্থের কাছ থেকে গরু প্রতি গত বছরের চেয়ে ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা বেশি দিয়ে কিনতে হয়েছে। এরপর গরু নিয়ে আসতে খরচও বেশি। গত বছর ট্রলার ভাড়া লেগেছিল ২৬ হাজার, এবার লেগেছে ৪২ হাজার। শুক্রবার একটা গরু বিক্রি করেছি ১ লাখ ৬০ হাজারে।
আফতাবনগর-সংলগ্ন সানভ্যালি গরুর হাটে বিশালাকৃতির সোনা বাবু ও রুপালি রাজকে দেখতে ভিড় করেন ছোট-বড় সব বয়সী মানুষ। গরু দুটি এনেছেন পাবনার খামারি বাহার উদ্দিন। তিনি ৪০টি গরু নিয়ে এসেছেন। এর মধ্যে সবার নজর কাড়ছে বড় আকৃতির গরু দুটি। ৩০ ও ২৭ মণ ওজনের এ দুই গরুর দাম হাঁকাচ্ছেন ৩১ লাখ টাকা।
বাহার উদ্দিন বলেন, খামারের একটি বড় জার্সি জাতের গাভীকে জার্মানি থেকে আনা উন্নত জাতের বীজ দেওয়া হয়েছিল। সেই বীজ থেকেই জন্ম নেয় গরু দুটি। জন্মের পর প্রথম দুই থেকে তিন বছর বাছুর দুটিকে মায়ের দুধ খাইয়ে বড় করা হয়। এরপর দীর্ঘ সময় ঘরের ভেতরে রেখে বিশেষ যত্নে লালন-পালন করা হয়েছে। গরু দুটির প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় রয়েছে- শুকনা খড়, গম ও ভুট্টার গুঁড়া। একই সঙ্গে এক কেজি বিস্কুটের গুঁড়া ও এক লিটার মিষ্টির রস খাওয়ানো হয়। শখ করেই গরু দুটির নাম রাখা হয়েছিল। সোনা বাবুর ওজন প্রায় ২৭ মণ এবং রুপালি রাজের ওজন ৩০ মণ।
রাজধানীর বাড্ডা থেকে পরিবার নিয়ে গরুর হাট দেখতে এসেছেন আমজাদ হোসেন। তিনি বলেন, এবার গরুর দাম গত বছরের তুলনায় কিছুটা বেশি মনে হচ্ছে।
উত্তর শাহজাহানপুর মৈত্রী সংঘ ক্লাবের খালি জায়গায় কুরবানির পশুর হাটে ফরিদপুর থেকে গরু নিয়ে এসেছেন ব্যবসায়ী শেখ আসাদুজ্জামান।
তিনি বলেন, গত ২২ মে হাটে এসেছি। এখনও তেমন বেচা বিক্রি হয়নি। তবে ঈদের আগে শেষ সময়ে বাজার জমে উঠবে। একই ধরনের তথ্য জানিয়েছেন পাবনা, কুষ্টিয়া, সিরাজগঞ্জ এবং নাটোরসহ সারা দেশ থেকে আসা খামারি ও ব্যবসায়ীরা।
রাজধানীর গাবতলীতে কুরবানির পশুর হাটে উঠানো হয়েছে ৫টি দুম্বা। রংপুরের বিসমিল্লাহ এগ্রোর মালিক মো. নাসিম আলী দুম্বাগুলো নিয়ে এসেছেন হাটে।
তিনি বলেন, দুম্বাগুলোর মধ্যে দুটির দাম চাওয়া হচ্ছে ৫ লাখ টাকা করে এবং বাকি তিনটির দাম সাড়ে ৪ লাখ টাকা করে। ক্রেতাদের অনেকেই ৩ লাখ টাকার নিচে দাম দেওয়ার কথা বলেছেন।
অন্যদিকে রাজধানীতে সকাল থেকেই তীব্র রোদ ও ভ্যাপসা গরমে হাঁসফাঁস অবস্থা কুরবানির পশুর হাটগুলোতে। খোলা মাঠে সারিবদ্ধভাবে রাখা পশুগুলোকে হাঁপাতে, বারবার মাথা ঝাঁকাতে ও ক্লান্ত হয়ে বসে পড়তে দেখা গেছে। কোথাও কোথাও ওপরের দিকে পলিথিন ও ত্রিপলের ছাউনি থাকলেও তাতে খুব একটা স্বস্তি মিলছে না। এমন পরিস্থিতিতে গরমের তীব্রতা কমাতে খামারি, রাখাল ও বিক্রেতারা গরুর শরীরে পানি ঢালছেন, তালপাখা ও চার্জার ফ্যান দিয়ে বাতাস করছেন। এ অবস্থায় গরুগুলোকে কিছুটা স্বস্তি দিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন রাখাল, বিক্রেতা ও খামারিরা। হাটজুড়ে বসানো অস্থায়ী চাপকলগুলোতে পানির জন্য ভিড় করছেন তারা। কেউ বোতলে পানি ভরছেন, কেউ বালতিতে। পরে সেই পানি গরুর শরীরে ঢেলে দিচ্ছেন। হাটের ভেতরে বেশ কিছু গরুকে জিভ বের করে দ্রুত শ্বাস নিতে দেখা যায়।
Leave a Reply