সবসময় ডেস্ক ::::সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবিপ্রবি) উন্নয়ন প্রকল্প ফেজ-২-এর আওতায় নির্মাণাধীন দুটি ভবনে নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ও মেয়াদোত্তীর্ণ সিমেন্ট ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। ৩৫ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন ক্লাব কমপ্লেক্স এবং ৪৪ কোটি টাকা ব্যয়ের বিদেশি শিক্ষার্থীদের হোস্টেল ভবনে মাটি মিশ্রিত বালু, মাটি-বালি মেশানো পাথর, মেয়াদোত্তীর্ণ সিমেন্ট ও বিভিন্ন ব্র্যান্ডের রড ব্যবহারের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, ক্লাব কমপ্লেক্সের নির্মাণকাজে ব্যবহারের জন্য রাখা বালুর বড় একটি অংশে মাটি মিশে আছে। বিষয়টি প্রথমে স্বীকার না করলেও একপর্যায়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রকল্প ব্যবস্থাপক (পিএম) মনসুর রহমান বালুর মধ্যে থাকা অংশকে মাটি হিসেবে স্বীকার করেন। তাঁর দাবি, এসব বালু জাফলং থেকে আনা হয় এবং মাঝেমধ্যে অসাবধানতাবশত মাটি চলে আসে।
নির্মাণকাজে ব্যবহৃত পাথরেও মাটি ও বালু মিশে থাকতে দেখা যায়। তবে এ বিষয়ে প্রকল্প ব্যবস্থাপকের কাছ থেকে স্পষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
ক্লাব কমপ্লেক্সের নির্মাণসামগ্রীর মধ্যে ফ্রেশ ব্র্যান্ডের সিমেন্ট পাওয়া যায়। কয়েকটি বস্তার গায়ে চলতি আগস্ট-সেপ্টেম্বর মাসে মেয়াদ শেষ হওয়ার তথ্য রয়েছে। কিছু বস্তার সিমেন্ট দীর্ঘদিন পড়ে থেকে শক্ত হয়ে পাথরের মতো হয়ে গেছে বলেও দেখা যায়।
এ ছাড়া নির্মাণকাজে এসসিআরএম (SCRM) স্টিল ও খাজা পিভিসি পাইপ ব্যবহারের তথ্য পাওয়া যায়। প্রতিবেদকের কাছে থাকা PWD-এর ২০১৮ সালের সিভিল ওয়ার্কসের তালিকা অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট রডের তালিকাভুক্তি ও অনুমোদনের বিষয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
একই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের আওতায় নির্মাণাধীন ৪৪ কোটি টাকা ব্যয়ের বিদেশি শিক্ষার্থীদের হোস্টেল ভবনেও মাটি মিশ্রিত বালু ব্যবহারের চিত্র দেখা যায়। সেখানে জেএসআরএম (JSRM) স্টিল ও ফ্রেশ ব্র্যান্ডের সিমেন্ট ব্যবহৃত হচ্ছে। কয়েকটি সিমেন্টের বস্তায় জুলাই মাসেই মেয়াদ শেষ হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সিভিল অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. এইচএমএ মাহজুজ বলেন, মেয়াদোত্তীর্ণ সিমেন্ট ব্যবহারে কাঙ্ক্ষিত শক্তি পাওয়া যায় না। অনেক সময় সিমেন্ট পাথরের মতো শক্ত হয়ে যাওয়ায় তা ভালোভাবে মিশ্রিত হয় না। ফলে কংক্রিটের গুণগত মান ও শক্তি নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে।
তিনি বলেন, সিমেন্ট দুই মাসের বেশি সময় সংরক্ষণ করা হলে তা ব্যবহার না করাই ভালো।
রডের বিষয়ে অধ্যাপক মাহজুজ বলেন, পরীক্ষায় PWD-এর নির্ধারিত ৬০ কেএসআই (কিলোপাউন্ড পার স্কয়ার ইঞ্চি) মান নিশ্চিত হলে রড ব্যবহারে আপত্তির যৌক্তিক কারণ নেই। তবে ভালো ব্র্যান্ড ও মানসম্মত রড ব্যবহারের পরামর্শ দেন তিনি।
পাথরের বিষয়ে তিনি বলেন, কংক্রিটে নির্দিষ্ট গ্রেডেশনের পাথর ব্যবহার করতে হয়। সাধারণত ১০ থেকে ১৯ মিলিমিটার পর্যন্ত বিভিন্ন আকারের পাথর নির্দিষ্ট অনুপাতে থাকা প্রয়োজন।
নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ও মেয়াদোত্তীর্ণ সিমেন্ট ব্যবহারের অভিযোগের বিষয়ে জানতে প্রকল্প ব্যবস্থাপক মনসুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রথমে বিভিন্ন কারণ দেখিয়ে ফোন কেটে দেন। পরে প্রধান প্রকৌশলী জয়নাল ইসলাম চৌধুরীকে সঙ্গে নিয়ে তিনি সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন।
মেয়াদোত্তীর্ণ সিমেন্টের ছবি দেখানো হলে প্রধান প্রকৌশলী জয়নাল ইসলাম চৌধুরী বলেন, তিনি হোয়াটসঅ্যাপ চেক করতে পারবেন না। নির্মাণকাজের সাইটে বিভিন্ন ধরনের মাটি ও বালু থাকতে পারে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
নিম্নমানের রড ও সিমেন্ট ব্যবহারের বিষয়ে জানতে চাইলে জয়নাল ইসলাম চৌধুরী বলেন, “PWD স্ট্যান্ডার্ড হলে ১০ নম্বর না ১২ নম্বর এগুলো নিয়ে আমাদের কোনো প্রশ্ন নেই।”
অভিযোগের জায়গাগুলো ল্যাবরেটরি পরীক্ষার জন্য পাঠানোর নির্দেশ দেন তিনি। পরীক্ষায় ভিন্ন ফল এলে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আজ পর্যন্ত অন্যরকম রিপোর্ট আসেনি।”
শীর্ষস্থানীয় তালিকায় না থাকা ব্র্যান্ডের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, আগে নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানগুলো তালিকার ওপরের দিকে এবং নতুন প্রতিষ্ঠানগুলো নিচের দিকে থাকে। তালিকায় নিচে থাকা মানেই নিম্নমানের নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এদিকে নির্মাণাধীন ভবন দুটির কাজ নির্ধারিত সময়ে শেষ হওয়া নিয়েও সংশয় রয়েছে। প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের বক্তব্য অনুযায়ী, ভবনগুলোর মূল নির্মাণকাজ ২০২৭ সালের জুনে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও আনুষঙ্গিক কাজ শেষ করতে ২০২৮ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।
অভিযোগের বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. খাইরুল ইসলামের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি ফোন কেটে দেন।
সূত্র : ডেইলি সান