দিপু সিদ্দিকী ::: সিলেটের হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজারে দান ব্যবস্থাপনায় হাত দেওয়ার রেশ কাটতে না কাটতেই জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলমকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। রোববার (২১ জুন) বিকেলে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একটি আদেশে তাঁকে সিলেটের জেলা প্রশাসকের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে মন্ত্রণালয়ে উপসচিব হিসেবে সংযুক্ত করা হয়। আদেশে প্রত্যাহারের সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ বা সিলেটের পরবর্তী নতুন ডিসি কে হবেন, তা উল্লেখ করা হয়নি।
মাজারের দানবাক্স ও ঐতিহাসিক দানের ডেগ সিলগালার ঘটনার রেশ ধরে সিলেটে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া তৈরি হওয়ার মাত্র তিন দিনের মাথায় এই প্রত্যাহারাদেশ আসায় বিষয়টিকে অনেকে এই বিতর্কের সঙ্গে যুক্ত করে দেখছেন। গত বছরের ১৮ আগস্ট সিলেটের দায়িত্ব নেওয়া সারওয়ার আলম প্রায় ১০ মাসের মাথায় ঢাকায় ফিরছেন। তাঁর এই আকস্মিক প্রত্যাহারের খবরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মিশ্র প্রতিক্রিয়া ও আলোচনা চলছে।
বিদায়ী জেলা প্রশাসকের (ডিসি) উদ্যোগেই গত কয়েক সপ্তাহে মাজারের দান ব্যবস্থাপনায় বড় পরিবর্তন আসে। গত ১২ জুন হযরত শাহজালাল (রহ.) ও হযরত শাহপরান (রহ.)-এর মাজার পরিদর্শনে গিয়ে তিনি বিদ্যমান দানবাক্সে তালা লাগানোর নির্দেশ দেন। এর আগে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা ও সিলেট সিটি কর্পোরেশনের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে জেলা প্রশাসন, ওয়াক্ফ এস্টেট, ইসলামিক ফাউন্ডেশন ও মাজার কর্তৃপক্ষের প্রতিনিধিদের নিয়ে একাধিক বৈঠকে মাজারের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় হিসাব সংরক্ষণ ও জবাবদিহিতা নিয়ে আলোচনা হয়।
এর ধারাবাহিকতায় ১৮ জুন বিকেলে জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের উপস্থিতিতে মাজারের তিনটি ঐতিহাসিক পিতলের দানের ডেগ সিলগালা করা হয়। একই সঙ্গে মাজারের মূল ফটকসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থানে একটি বড় কেন্দ্রীয় দানবাক্স এবং কয়েকটি ছোট দানবাক্স স্থাপন করা হয়, যেগুলোর নিরাপত্তায় আনসার সদস্য নিয়োগ দেওয়া হয়।
বিদায়ী জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলম বলেন, দীর্ঘদিন ধরে মাজারে দানের অর্থ সংগ্রহ ও বণ্টনের ক্ষেত্রে একটি অনিয়মতান্ত্রিক ব্যবস্থা চালু ছিল, যেখানে দানের অর্থ হাতে হাতে গ্রহণ করা হতো। তিনি বলেন, মাজারে প্রদত্ত দান জনগণের অর্থ এবং এর ব্যবহারে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা প্রশাসনের দায়িত্ব। তিনি জানান, মাজারের আয়-ব্যয়ের কোনো সুসংগঠিত হিসাবপত্র সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পাওয়া যায়নি। উদাহরণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন, সরকারি অর্থায়নে মাজারে প্রায় ৩০ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি ভবন নির্মাণ প্রকল্প চলমান রয়েছে। এর মধ্যে ২৫ কোটি টাকা সরকার দিচ্ছে এবং বাকি ৫ কোটি টাকার একটি অংশ মাজার কর্তৃপক্ষের দেওয়ার কথা থাকলেও আয়ের উৎস ও হিসাব সংক্রান্ত প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর পাওয়া যায়নি।
ডিসির ভাষ্য অনুযায়ী, মাজার, মসজিদ ও মাদ্রাসাকে সমন্বিত করে একটি আধুনিক ইসলামিক কমপ্লেক্স গড়ে তোলার পরিকল্পনা ছিল। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট মাদ্রাসাকে উচ্চমানের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে উন্নীত করার উদ্যোগও নেওয়ার কথা জানিয়েছিলেন তিনি।
এদিকে ডেগ সিলগালার পর একদল মাজার-ভক্ত দরগাহ প্রাঙ্গণে বিক্ষোভ করেন। তাঁদের অভিযোগ, শত শত বছরের প্রচলিত রীতিতে হস্তক্ষেপ করা হয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন অনুসারী বলেন, প্রায় সাতশ বছর ধরে চলে আসা দান ব্যবস্থাপনায় হঠাৎ পরিবর্তন আনা ঐতিহ্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
দরগাহের অন্যতম খাদেম মুফতি রায়হান উদ্দিন (মুন্না) বলেন, দানবাক্স সিলগালার প্রক্রিয়াটি যথাযথ নয় এবং এটি মাজার ও অলি-আউলিয়াবিরোধী কর্মকাণ্ড বলে তিনি মনে করেন। তাঁর দাবি, দানের অর্থ শুধু খাদেমদের জন্য ব্যয় হয় না, বরং মসজিদ, মাদ্রাসা ও মাজারের উন্নয়নেও ব্যবহার করা হয়। হিসাব চাওয়ার অধিকার সবার থাকলেও জোরপূর্বক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পদ্ধতি তিনি সমর্থন করেন না।
এর মধ্যেই ২০ জুন বিকেলে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে দানবাক্সগুলোর ওপর সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়, যার মাত্র একদিন পরই এলো জেলা প্রশাসকের প্রত্যাহারাদেশ।
অভিযোগ রয়েছে, শত শত বছর ধরে শাহজালাল মাজারে ভক্তদের দানের টাকা মাজারের খাদেম পরিবারের মধ্যে বণ্টন করে থাকেন। এছাড়া দান হিসেবে আসা গরু, ছাগল, মুরগিও এসব পরিবার নিজেদের মধ্যে ভাগবাটোয়ারা করে নেন বলে অভিযোগ আছে, যা একাধিক খাদেম বিভিন্ন সময়ে প্রকাশ্যে স্বীকারও করেছেন।
জেলা প্রশাসকের আকস্মিক প্রত্যাহারে শাহজালাল (রহ.) মাজারের দান ব্যবস্থাপনা সংস্কারের উদ্যোগ এখন কোন পথে এগোবে, নতুন জেলা প্রশাসক কে হবেন এবং তিনি এই সংস্কার প্রক্রিয়া কীভাবে এগিয়ে নেবেন- তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে সিলেটে।
Leave a Reply