দিপু সিদ্দিকী :::: সিলেট সিটি কর্পোরেশনের (সিসিক) অঞ্চল-০৬ থেকে ইস্যুকৃত ১১টি ভুয়া জন্মসনদের চাঞ্চল্যকর ঘটনা ফাঁস হয়েছে। ব্রিটিশ হাইকমিশনের তদন্তে জালিয়াতির বিষয়টি ধরা পড়ার পর স্থানীয় সরকার বিভাগ, রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয় ও সিসিক প্রশাসনে তোলপাড় শুরু হয়েছে। এ ঘটনা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের পাসপোর্ট, ভিসা যাচাই ও নাগরিক নিবন্ধন ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলতে পারে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, একটি সংঘবদ্ধ চক্র ডিজিটাল জন্মনিবন্ধন ব্যবস্থার (জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের জন্য সরকারের ডিজিটাল ডাটাবেজ ‘বার্থ এন্ড ডেথ রেজিস্ট্রেশন ইনফরমেশন সিস্টেম) ফাঁকফোকর ব্যবহার করে এসব ভুয়া জন্মসনদ তৈরি করেছে।
ব্রিটিশ হাইকমিশনের সরবরাহ করা তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, জন্মসনদগুলোর বিপরীতে জমা দেওয়া জাতীয় পরিচয়পত্র, মায়ের পাসপোর্ট এবং ম্যানুয়াল জন্মসনদের কপিসহ প্রায় সব নথিই ছিল জাল। এমনকি প্রতিটি আবেদনে জন্মস্থান হিসেবে “সিলেট সিটি কর্পোরেশন” উল্লেখ করা হলেও তার পক্ষে কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বিডিআরআইএস সিস্টেম অনুযায়ী জন্মসনদ অনুমোদনের আগে নিবন্ধন সহকারী ও নিবন্ধকের পৃথক অনুমোদন প্রয়োজন হয়। কিন্তু দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা যথাযথ যাচাই-বাছাই ছাড়াই আবেদনগুলো অনুমোদন দেন। ফলে ভুয়া তথ্য ব্যবহার করেই সনদগুলো চূড়ান্তভাবে সিস্টেমে নিবন্ধিত হয়।
এ ঘটনায় রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয় থেকে পাঠানো ২৭ এপ্রিল এক চিঠিতে (স্মারক নং: ৪৬.০৪.০০০০.০০০.১০৩.৩৪.০০০৩.২৪.১২৮) সিসিকের অঞ্চল-০৬ এর দুই কর্মকর্তাকে সরাসরি দায়ী করা হয়েছে। তারা হলেন অঞ্চল-০৬ এর নিবন্ধক ও প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মো. জাহিদুল ইসলাম এবং নিবন্ধন সহকারী নজরুল ইসলাম।
চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, তাদের কর্মকাণ্ড ‘জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন আইন, ২০০৪’-এর ২১(১) ধারার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন এবং দায়িত্বে চরম অবহেলা ও অসদাচরণের শামিল। একই সঙ্গে নজরুল ইসলামের নিবন্ধন ক্ষমতা অবিলম্বে প্রত্যাহার করে অন্য কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
শুধু কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেই নয়, ভুয়া তথ্য দিয়ে জন্মসনদ গ্রহণকারী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেও আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। চিঠিতে বলা হয়েছে, আবেদনকারীরা ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা জন্মস্থান ও পরিচয় তথ্য প্রদান করেছেন, যা ‘জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন আইন, ২০০৪’-এর ২১(২) ধারা অনুযায়ী দণ্ডনীয় অপরাধ। সংশ্লিষ্ট ১১ জনকে চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলে জানা গেছে।
এদিকে রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী সিসিক অঞ্চল-০৬ কর্তৃক ইস্যুকৃত ১১টি জন্ম নিবন্ধন স্থায়ীভাবে বাতিল করা হয়েছে। সিসিকের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ও নিবন্ধক ডা. মো. জাহিদুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে গত ৭ মে বিষয়টিকে ‘অত্যন্ত জরুরি’ উল্লেখ করে বাতিল হওয়া ব্যক্তিদের নাম ও ঠিকানা প্রকাশ করা হয়।
বাতিল হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন বিশ্বনাথের শেখের গাঁও (সিংগের কাছ বাজার) এলাকার মোছা. আফিয়া বেগম, সিসিকের ২৩ নম্বর ওয়ার্ডের মাছিমপুর (দোয়েল-১২) এলাকার রুনা বেগম ও রুজিনা আক্তার এবং কায়েস্তরেল কনকর্ড আবাসিক এলাকার (বাসা নং-২৫) মোছা. রাজনা বেগম।
তালিকায় আরও রয়েছেন সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার কুলঞ্জ ইউনিয়নের টংঘর (তারাপাশা) এলাকার মোছা. ফাতেহা বেগম, মো. মানিক মিয়া ও মো. ফাতেমা বেগম। এছাড়া বিশ্বনাথ এলাকার মোছা. শামছিয়া বেগম ও দুদু মিয়া, দক্ষিণ সুনামগঞ্জের পূর্ব পাগলা ইউনিয়নের নোয়াগাঁও এলাকার জিলু মিয়া এবং ছাতকের ছৈলা আফজালাবাদ ইউনিয়নের বাসনাকান্দি (গোবিন্দগঞ্জ) এলাকার মো. বাবুল মিয়ার জন্ম নিবন্ধনও বাতিল করা হয়েছে।
সিটি কর্পোরেশন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বাতিলের আদেশ ইতোমধ্যে কার্যকর করা হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরগুলোতে অনুলিপি পাঠিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর সিসিকসহ স্থানীয় সরকার বিভাগের বিভিন্ন পর্যায়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, অতীতেও কিছু অনিয়মের অভিযোগ উঠলেও এবারই প্রথম বিদেশি মিশনের তদন্তে বড় পরিসরে জন্মসনদ জালিয়াতির তথ্য সামনে এসেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিদেশি দূতাবাস ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর কাছে জন্মসনদ একটি গুরুত্বপূর্ণ নাগরিক পরিচয়পত্র। ফলে এ ধরনের জালিয়াতি বাংলাদেশের পাসপোর্ট, ভিসা যাচাই ও জাতীয় তথ্যব্যবস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তারা ভবিষ্যতে এমন ঘটনা ঠেকাতে ডিজিটাল সিস্টেমে আরও কঠোর মনিটরিং, বহুমাত্রিক তথ্য যাচাই, নিয়মিত অডিট এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন।
সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক সূত্র জানিয়েছে, পুরো ঘটনার তদন্ত আরও বিস্তৃত করা হচ্ছে এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের জালিয়াতি প্রতিরোধে কঠোর মনিটরিং ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এ ব্যাপারে সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. জাহিদ হোসেন জালিয়াতির ঘটনা স্বীকার করে বলেন, সংঘবদ্ধ চক্র ২০২৪ সাল এবং ২০২৫ সালের বিভিন্ন সময়ে ভূয়া কাগজপত্র জমা দিয়ে জন্ম নিবন্ধন করেছে। আমরা বিষয়টি জানার পর তা বাতিল করেছি। তিনি বলেন, জন্ম নিবন্ধনকালে এনআইডি যাচাইয়ের কোনো সুযোগ আমাদের নেই।
এ কারণে তাদের দেওয়া ডকুমেন্টসের ওপর ভিত্তি করে জন্ম নিবন্ধন ইস্যু করা হয়েছে। রেজিস্ট্রার জেনারেলের অফিস থেকে যে নির্দেশনা এসেছে, তা অনুযায়ী কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিচ্ছে। তিনি বলেন, এ ঘটনায় আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে সম্মানহানি হয়েছে। ভবিষ্যতে যাতে এ ধরনের কোনো ঘটনা কেউ ঘটাতে না পারে, সেজন্য সর্ব্বোচ্চ সতর্ক থেকে কাজ করছি আমরা।
Leave a Reply