জাপানে হাম সংক্রমণ দ্রুত ও উদ্বেগজনকভাবে বেড়ে গেছে, যদিও দেশটি ২০১৫ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা-এর কাছ থেকে “হাম নির্মূল” দেশ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছিল। স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের এপ্রিলের মাঝামাঝি পর্যন্ত আক্রান্তের সংখ্যা ২৯৯ জনে পৌঁছেছে, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় চার গুণ বেশি। বিশেষজ্ঞরা এটিকে গত এক দশকের মধ্যে দ্বিতীয় দ্রুততম সংক্রমণ বৃদ্ধির ধারা হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ, যা বাতাসের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তে পারে। একজন আক্রান্ত ব্যক্তি একই স্থানে থাকলেই আশপাশের বহু মানুষ সংক্রমিত হতে পারে। সংক্রমণের প্রায় ৭–১০ দিনের মধ্যে জ্বর, সর্দি, কাশি ও চোখে জ্বালাভাব দেখা দেয় এবং পরবর্তীতে সারা শরীরে লাল র্যাশ ছড়িয়ে পড়ে। গুরুতর ক্ষেত্রে নিউমোনিয়া, মস্তিষ্কে প্রদাহ (এনসেফালাইটিস) এবং মৃত্যুঝুঁকি পর্যন্ত দেখা দিতে পারে।
সরকারি তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, সংক্রমণের বড় অংশ শহরাঞ্চলে কেন্দ্রীভূত। বিশেষ করে টোকিও, কানাগাওয়া, চিবা ও সাইতামা অঞ্চলে সবচেয়ে বেশি কেস পাওয়া গেছে। জনবহুল পরিবেশ, গণপরিবহন ব্যবহার এবং আন্তর্জাতিক যাতায়াত এই অঞ্চলগুলোতে ভাইরাস দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। একই সঙ্গে আইচি ও কাগোশিমার মতো এলাকায় ছোট ছোট ক্লাস্টার আকারেও সংক্রমণ দেখা গেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সংক্রমণ বৃদ্ধির পেছনে দুটি প্রধান কারণ রয়েছে— বিদেশ থেকে ভাইরাস প্রবেশ এবং টিকাদানের হার কমে যাওয়া। পর্যটন ও আন্তর্জাতিক ভ্রমণ বাড়ার কারণে বাইরে থেকে আসা সংক্রমণ জাপানে নতুন করে ছড়াচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
অন্যদিকে, টিকাদান ব্যবস্থার দুর্বলতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। জাপানে শিশুদের জন্য দুই ডোজ এমআর টিকা দেওয়া হয়—একটি ১ বছর বয়সে এবং আরেকটি স্কুলে ভর্তি হওয়ার আগে। তবে ২০০৬ সালের আগে এক ডোজ বা কোনো টিকাই অনেকের দেওয়া হয়নি, ফলে এখন প্রাপ্তবয়স্কদের একটি অংশ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
করোনাভাইরাস মহামারির পর টিকা গ্রহণের হার আরও কমে গেছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দ্বিতীয় ডোজ টিকার হার নেমে এসেছে প্রায় ৯১ শতাংশে, যেখানে হার্ড ইমিউনিটি বজায় রাখতে অন্তত ৯৫ শতাংশ কভারেজ প্রয়োজন। ফলে জনসংখ্যার একটি বড় অংশ এখনও পর্যাপ্ত সুরক্ষার বাইরে থেকে যাচ্ছে, যা ভাইরাস ছড়ানোর সুযোগ তৈরি করছে।
নারা প্রিফেকচারের শিশু রোগ বিশেষজ্ঞ তাইটো কিতানো বলেন, জাপানে পর্যাপ্ত হার্ড ইমিউনিটি না থাকায় সামান্য সংক্রমণও বড় আকারে ছড়িয়ে পড়তে পারে। তিনি সতর্ক করে বলেন, টিকাদান কাভারেজ না বাড়ালে ভবিষ্যতে বড় ধরনের প্রাদুর্ভাবের ঝুঁকি রয়েছে।
এদিকে রাজধানী টোকিওসহ বিভিন্ন শহরে টিকা নেওয়ার প্রবণতা আবারও বাড়ছে। অনেকেই সংক্রমণের ভয় এবং নিজেদের টিকা নেওয়ার ইতিহাস সম্পর্কে অনিশ্চয়তার কারণে পুনরায় টিকা নিতে আসছেন। তবে সমস্যা হলো খরচ। সাধারণত এক ডোজ এমআর টিকার দাম প্রায় ১০,০০০ ইয়েন (প্রায় ৬৪ ডলার), যা অনেকের জন্য ব্যয়বহুল।
চিকিৎসক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতিতে সরকারের সক্রিয় ভূমিকা প্রয়োজন। তারা টিকার খরচ সরকারি ভর্তুকির আওতায় আনার আহ্বান জানিয়েছেন, যাতে টিকাদানের হার দ্রুত বাড়ে এবং সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়।
একসময় “হাম-মুক্ত” ঘোষণা পাওয়া জাপানে আবারও সংক্রমণের এই ঊর্ধ্বগতি জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য বড় সতর্ক সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত টিকাদান বৃদ্ধি এবং সচেতনতা না বাড়ালে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।
Leave a Reply