বিদ্যুৎ বিল ও নিত্যপণ্যের দাম নিয়ে শুরু হওয়া ক্ষোভ এখন রূপ নিয়েছে শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে ব্যাপক জনঅসন্তোষে। দীর্ঘদিন ধরে কাশ্মীর ইস্যুতে আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল নিয়ন্ত্রণরেখার (এলওসি) ভারত-শাসিত অংশ। সেখানে দমন-পীড়ন, বিদ্রোহ, সামরিক উপস্থিতি ও ভারত-পাকিস্তান উত্তেজনাই বেশি আলোচিত হয়েছে।
তবে তুলনামূলকভাবে আড়ালে থাকা পাকিস্তান-শাসিত কাশ্মীর সরকারিভাবে আজাদ জম্মু ও কাশ্মীর (এজেকে)—এ এখন সাম্প্রতিক দশকের অন্যতম বড় গণবিক্ষোভ চলছে। ইসলামাবাদ যেটিকে এতদিন ভারত-শাসিত কাশ্মীরের বিপরীতে স্বশাসনের মডেল হিসেবে তুলে ধরত, সেই অঞ্চলেই এখন শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে ক্ষোভ তীব্র হয়ে উঠেছে।
প্রথমে বিদ্যুৎ বিল, আটা ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে শুরু হওয়া আন্দোলন এখন রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব, জবাবদিহি ও আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে রূপ নিয়েছে। এই আন্দোলনের নেতৃত্ব দিচ্ছে জয়েন্ট আওয়ামি অ্যাকশন কমিটি (জেএএসি)। ২০২৩ সালে ব্যবসায়ী, আইনজীবী, শিক্ষার্থী, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি ও স্থানীয় রাজনৈতিক কর্মীদের সমন্বয়ে গঠিত এই জোট প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলোর বাইরে থেকেই সংগঠিত হয়। তাদের প্রধান দাবি ছিল বিদ্যুতের অতিরিক্ত বিল কমানো, আটার দাম হ্রাস, করের বোঝা লাঘব এবং জনসেবার মান উন্নয়ন।
বিশ্লেষকদের মতে, এজেকেতে যুব বেকারত্বের হার প্রায় ২৭ শতাংশ, যা পাকিস্তানের জাতীয় গড়ের প্রায় তিন গুণ। নারীদের আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থানও ৮ শতাংশের নিচে। পাহাড়ি অঞ্চলের দুর্বল অবকাঠামো, সীমিত স্বাস্থ্যসেবা এবং ২০০৫ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পের দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়িয়েছে।
২০২৪ ও ২০২৫ সালে সরকার বিদ্যুতের দাম কমানো ও আটায় ভর্তুকি দেওয়ার মতো কিছু দাবি মেনে নিলেও আন্দোলনকারীদের মতে, এগুলো কেবল সাময়িক সমাধান। তাদের দাবি, মূল সমস্যা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ।
বর্তমান সংকটের অন্যতম বড় কারণ আজাদ কাশ্মীরের আইনসভায় সংরক্ষিত ১২টি শরণার্থী আসন। মোট ৫৩ সদস্যের পরিষদে ৩৩ জন সরাসরি আজাদ কাশ্মীরের বাসিন্দাদের ভোটে নির্বাচিত হন। বাকি ১২টি আসনে ভোট দেন ১৯৪৭ ও ১৯৬৫ সালের যুদ্ধের সময় ভারত-শাসিত কাশ্মীর থেকে পাকিস্তানে চলে যাওয়া কাশ্মীরি শরণার্থীরা, যারা বর্তমানে পাকিস্তানের বিভিন্ন প্রদেশে বসবাস করেন।
পাকিস্তানের মতে, এই আসনগুলো বিতর্কিত কাশ্মীরের সমগ্র জনগণের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করে এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তাদের অবস্থানকে শক্তিশালী করে। কিন্তু জেএএসি ও স্থানীয় সমালোচকদের অভিযোগ, এই আসনগুলো ব্যবহার করে ইসলামাবাদ-সমর্থিত দলগুলো সরকার গঠনে প্রভাব বিস্তার করে। ফলে আজাদ কাশ্মীরের জনগণের ভোটের প্রতিফলন সরকারে যথাযথভাবে দেখা যায় না।
সংরক্ষিত আসন বাতিলের দাবিতে জেএএসির আন্দোলন ও নির্বাচনে বয়কটের আহ্বানের মধ্যে আঞ্চলিক নির্বাচন তিন ধাপে আয়োজন করা হয়। তবে প্রথম দুই ধাপেই ভোটার উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে কম ছিল। এদিকে পাকিস্তান পিপলস পার্টি (পিপিপি) ক্ষমতাসীন পাকিস্তান মুসলিম লীগ-নওয়াজের (পিএমএল-এন) বিরুদ্ধে নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ তুলেছে।
একই সময়ে কাশ্মীর বানেগা খুদমুখতার (কাশ্মীর হবে স্বাধীন) স্লোগানও আন্দোলনে নতুন মাত্রা পেয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি ভারত-পাকিস্তানের প্রচলিত অবস্থানের বাইরে নতুন রাজনৈতিক চিন্তার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
প্রথমদিকে সরকার আলোচনার মাধ্যমে বিদ্যুৎ ও আটার ভর্তুকি দিলেও আন্দোলন রাজনৈতিক সংস্কারের দাবিতে বিস্তৃত হওয়ার পর কঠোর অবস্থান নেয়। গত ৫ জুন জেএএসিকে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয় এবং সংগঠনের নেতা শওকত মিরসহ বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে নতুন কর্মসূচিকে ঘিরে নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে প্রধানত আন্দোলনকারীসহ ৪৫ জনের বেশি মানুষ নিহত হওয়ার তথ্য বিভিন্ন স্বাধীন সূত্রে উঠে এসেছে। তবে ইন্টারনেট বন্ধ, কারফিউ ও তথ্যপ্রবাহ সীমিত থাকায় এসব তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা কঠিন।
সরকারের দাবি, সাংবিধানিক বিরোধ আদালত ও সংসদের মাধ্যমে সমাধান হওয়া উচিত, রাজপথে নয়। অন্যদিকে আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, তাদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলন দমনে বলপ্রয়োগ করা হচ্ছে। চলমান অস্থিরতার কারণে দীর্ঘ সময় ধরে ইন্টারনেট সেবা বন্ধ থাকায় ব্যবসা-বাণিজ্য ও পর্যটন খাত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। রাওয়ালাকোটসহ বিভিন্ন এলাকায় কারফিউ ও সড়ক অবরোধে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হয়েছে।
স্থানীয়দের মতে, অর্থনৈতিক সংকটের পাশাপাশি রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং শাসনব্যবস্থার প্রতি আস্থাহীনতা আজাদ কাশ্মীরকে নতুন এক সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে। ২০১৯ সালে ভারত জম্মু ও কাশ্মীরের বিশেষ সাংবিধানিক মর্যাদা বাতিল করার পর পাকিস্তান-শাসিত কাশ্মীরেও রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটে।
অনেক বাসিন্দার অভিযোগ, ওই ঘটনার পর কাশ্মীর ইস্যুতে ইসলামাবাদের প্রতিক্রিয়া যথেষ্ট জোরালো ছিল না। একই সঙ্গে চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর (সিপিইসি) ঘিরে ভবিষ্যতে আজাদ কাশ্মীরের সাংবিধানিক অবস্থান পরিবর্তনের আশঙ্কাও জনমনে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
Leave a Reply