সিলেটের গোয়াইনঘাটে বিছানাকান্দি সীমান্ত দিয়ে ভারত থেকে আসা গরু-মহিষকে বৈধ দেখাতে অভিনব কৌশলে চলছে রশিদ জালিয়াতির অভিযোগ। সীমান্তঘেঁষা কথিত ‘পীরের বাজার’ থেকে গরু সংগ্রহ করে সেগুলোর সঙ্গে দেওয়া হচ্ছে অন্য একটি বৈধ হাটের রশিদ। আর সেই রশিদ দেখিয়েই দেশের বিভিন্ন স্থানে নির্বিঘ্নে পাঠানো হচ্ছে গরু।
অভিযোগ রয়েছে, পীরের বাজার থেকে কেনা গরুর বিপরীতে ব্যবহার করা হচ্ছে ‘মাতুরতল বাজার হাট, গোয়াইনঘাট, সিলেট’-এর রশিদ। ফলে কাগজে-কলমে গরুগুলো বৈধ হাট থেকে কেনা দেখানো হলেও বাস্তবে সেগুলোর উৎস ভিন্ন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে একটি সংঘবদ্ধ চক্র এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ভারতীয় চোরাই গরুকে বৈধতার আবরণ দেওয়ার চেষ্টা করছে। এ ঘটনায় স্থানীয় প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও উঠেছে গুরুতর প্রশ্ন।
গত শুক্রবার (১৪ আগস্ট) সিলেটের বঙ্গবীর সড়কে সরেজমিন অনুসন্ধানে গিয়ে গরুবোঝাই একাধিক পিকআপ ও মিনি ট্রাকের গতিপথ এবং তাদের হাতে থাকা রশিদের মধ্যে অসঙ্গতি দেখা যায়।
গরুবোঝাই কয়েকটি গাড়ি থামিয়ে রশিদ যাচাই করে দেখা যায়, রশিদের উপরের অংশে স্পষ্টভাবে লেখা ‘মাতুরতল বাজার হাট, গোয়াইনঘাট, সিলেট’।
কিন্তু গাড়ির চালকদের সঙ্গে কথা বললে তারা জানান, গরুগুলো তারা মাতুরতল বাজার থেকে নয়, পীরের বাজার এলাকা থেকে গাড়িতে তুলেছেন।
পীরের বাজার থেকে গরু বোঝাই করার পর মাতুরতল বাজারের রশিদ তাদের কাছে এল কীভাবে এমন প্রশ্নের সুস্পষ্ট উত্তর দিতে পারেননি চালকরা। তবে তাদের একজনের দাবি, ‘হেলাল ভাই’ নামে এক ব্যক্তি তাদের হাতে এসব রশিদ তুলে দিয়েছেন।
এক চালক জানান, ওইদিন সকাল থেকেই একই প্রক্রিয়ায় পীরের বাজার থেকে গরুবোঝাই করে বহু গাড়ি বিভিন্ন গন্তব্যে ছেড়ে যায়। তার ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় ২০ থেকে ৩০টি গাড়ি একই ধরনের রশিদ নিয়ে ওই এলাকা থেকে বের হয়েছে।
অনুসন্ধানের সময় আরও একটি বিষয় চোখে পড়ে। গাড়িগুলোর রশিদে মাতুরতল বাজারের নাম থাকলেও গাড়িগুলো আসছিল বঙ্গবীর পয়েন্টের দিক থেকে।
সাংবাদিকরা চালকদের কাছে জানতে চান রশিদ যদি মাতুরতল বাজারের হয়, তাহলে গাড়িগুলো অন্য দিক থেকে কেন আসছে?
এ প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর দিতে পারেননি সংশ্লিষ্টরা।
বরং কয়েকজন গাড়িতে থাকা ব্যক্তি সাংবাদিকদের ভিডিও ধারণে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। পরে তারা রশিদে থাকা বাজার কর্তৃপক্ষের নম্বরে ফোন করে বিষয়টি যাচাই করার কথা বলেন।
এতে পুরো বিষয়টি নিয়ে আরও সন্দেহ তৈরি হয়।
স্থানীয় একাধিক সূত্রের দাবি, কথিত এই রশিদ-বাণিজ্যের নেপথ্যে রয়েছেন চার ব্যক্তি হেলাল উদ্দিন, ফরিদুল, সেবুল ও ইমাম।
অভিযোগ অনুযায়ী, তারা পীরের বাজার থেকে সংগ্রহ করা গরুর সঙ্গে মাতুরতল বাজারের রশিদ সরবরাহ করে থাকেন। এভাবে প্রকৃত উৎস গোপন রেখে গরুগুলোকে বৈধ হাট থেকে কেনা পশু হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।
তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
স্থানীয়দের প্রশ্ন, একটি হাট থেকে পশু কেনার পর অন্য হাটের রশিদ কীভাবে গাড়ির চালকের হাতে পৌঁছাচ্ছে? কারা এসব রশিদ সরবরাহ করছে এবং এর বিনিময়ে কী পরিমাণ অর্থ লেনদেন হচ্ছে এসব বিষয় তদন্তের দাবি রাখে।
সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে।
একাধিক সূত্রের দাবি, এই অবৈধ কার্যক্রম নির্বিঘ্নে পরিচালনার ক্ষেত্রে প্রশাসনের একটি অংশের নীরব সমর্থন বা যোগসাজশ থাকতে পারে। এমনকি গোয়াইনঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রতন কুমার অধিকারীর বিরুদ্ধেও অবৈধ সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ করেছেন কয়েকজন স্থানীয় ব্যক্তি।
তবে এই অভিযোগের পক্ষে কোনো প্রত্যক্ষ প্রমাণ অনুসন্ধানে পাওয়া যায়নি এবং ইউএনওর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগকে নিশ্চিত তথ্য হিসেবে দাবি করার সুযোগ নেই।
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে গোয়াইনঘাট ইউএনও রতন কুমার অধিকারীর ব্যবহৃত মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। একইভাবে অভিযুক্ত হিসেবে যাদের নাম এসেছে হেলাল উদ্দিন, ফরিদুল, সেবুল ও ইমামের সঙ্গেও যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এক হাটের নামে কেনা পশুর পরিবর্তে অন্য হাটের রশিদ ব্যবহার করা হলে শুধু চোরাচালানই নয়, সরকারের রাজস্ব ব্যবস্থাপনাতেও বড় ধরনের প্রশ্ন তৈরি হয়।
কারণ, পশুর প্রকৃত উৎস ও লেনদেনের তথ্য আড়াল করা হলে সংশ্লিষ্ট হাটের প্রকৃত বেচাকেনা, রাজস্ব আদায় এবং পশু পরিবহনের হিসাবেও অসঙ্গতি তৈরি হতে পারে।
এছাড়া সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে ভারতীয় গরু প্রবেশ করে থাকলে সেটি কীভাবে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বৈধ কাগজপত্রের আড়ালে চলে যাচ্ছে সেটিও তদন্তের দাবি রাখে।
স্থানীয় সচেতন মহলের প্রশ্ন?
পীরের বাজার থেকে আসা গরু যদি সত্যিই মাতুরতল বাজার থেকে কেনা দেখিয়ে পরিবহন করা হয়ে থাকে, তাহলে এই রশিদ সরবরাহ করছে কারা?
এই চক্রের সঙ্গে আরও কারা জড়িত, প্রতিদিন কতটি গরু এই প্রক্রিয়ায় দেশের বিভিন্ন স্থানে যাচ্ছে, এর মাধ্যমে কত টাকার লেনদেন হচ্ছে এবং সরকারি রাজস্বের কী পরিমাণ ক্ষতি হচ্ছে এসব বিষয় খতিয়ে দেখতে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি উঠেছে।
স্থানীয়রা বলছেন, শুধু কয়েকজন রশিদ সরবরাহকারীকে চিহ্নিত করলেই হবে না। গরুর প্রকৃত উৎস থেকে শুরু করে রশিদ সরবরাহ, পরিবহন ও দেশের বিভিন্ন স্থানে পৌঁছানো পর্যন্ত পুরো নেটওয়ার্কের তদন্ত প্রয়োজন।
একই সঙ্গে প্রশাসনের কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীর বিরুদ্ধে অবৈধ সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ সত্য হলে তার বিরুদ্ধেও আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট প্রাণিসম্পদ কর্তৃপক্ষের যৌথ তদন্ত হলে কথিত এই ‘রশিদ সিন্ডিকেটের’ প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।