ইব্রাহিম মাহমুদ:::সিলেটের মহাসড়কগুলোতে ত্রি-হুইলার চলাচলের ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকলেও বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। সিলেট-ঢাকা, সিলেট-তামাবিল ও সিলেট-সুনামগঞ্জসহ বিভিন্ন মহাসড়কে অবাধে চলছে সিএনজিচালিত অটোরিকশা, টমটমসহ নানা ধরনের তিন চাকার যান। এসব যানবাহনের অবাধ চলাচলে একদিকে যেমন বাড়ছে দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি, অন্যদিকে সৃষ্টি হচ্ছে তীব্র যানজট।
সর্বশেষ শনিবার সিলেট-ঢাকা মহাসড়কের ওসমানীনগরে সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও তেলবাহী ট্যাংক লরির মুখোমুখি সংঘর্ষে একই পরিবারের তিনজনসহ চারজন নিহত হন। এর আগে গত ৯ আগস্ট হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলার বেজুরা এলাকায় ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে সিএনজি অটোরিকশার ত্রিমুখী সংঘর্ষে প্রাণ হারান আরও দুজন।
দুর্ঘটনার এমন ধারাবাহিকতার মধ্যেও মহাসড়কে ত্রি-হুইলারের চলাচল থামছে না।
রোববার দুপুরে সিলেট-ঢাকা মহাসড়কের দয়ামীর এলাকা থেকে চন্ডিপুল হয়ে শেরপুর পর্যন্ত ঘুরে দেখা যায়, মহাসড়কের ওপর দিয়েই নির্বিঘ্নে চলছে সিএনজি অটোরিকশা, টমটমসহ বিভিন্ন ত্রি-হুইলার। মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে গড়ে উঠেছে এসব যানবাহনের স্ট্যান্ড। কোথাও কোথাও একটি স্ট্যান্ডে ২০ থেকে ৫০টি পর্যন্ত ত্রি-হুইলার দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। মহাসড়কের ওপরই চলছে যাত্রী ওঠানামা।
অভিযোগ রয়েছে, এসব অবৈধ স্ট্যান্ডের কারণে শুধু দুর্ঘটনার ঝুঁকিই বাড়ছে না, যান চলাচলেও তৈরি হচ্ছে বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা। তাজপুর বাজার, গোয়ালাবাজারসহ সিলেট-ঢাকা মহাসড়কের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় সিএনজি স্ট্যান্ডকে কেন্দ্র করে নিয়মিত যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে।
মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে পুলিশের উপস্থিতি থাকলেও ত্রি-হুইলার চলাচলে কার্যকর কোনো বাধা দেখা যায়নি।
মহাসড়কে চলাচলকারী একাধিক সিএনজি অটোরিকশাচালকের অভিযোগ, নির্দিষ্ট অঙ্কের মাসোহারা দেওয়ার বিনিময়ে মহাসড়কে অটোরিকশা চালানোর সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। তাদের দাবি, স্থানীয় সিএনজি অটোরিকশা সমিতির মাধ্যমে এসব টাকা দেওয়া হয়। এ কারণেই মহাসড়কের বিভিন্ন এলাকায় গড়ে উঠেছে একাধিক অটোরিকশা সমিতি।
চালকদের অভিযোগ, সমিতির আওতাভুক্ত অটোরিকশাগুলো অনেকটা নির্বিঘ্নে চলাচল করলেও সমিতির বাইরে থাকা অটোরিকশাগুলোকে পুলিশ আটক করে। ফলে মহাসড়কে ত্রি-হুইলার চলাচলের ক্ষেত্রে তৈরি হয়েছে এক ধরনের বৈষম্য ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা।
তবে এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
এদিকে গত ১৯ আগস্ট স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ স্পষ্ট করে বলেছেন, কোনো অবস্থাতেই মহাসড়কে থ্রি-হুইলার চলতে দেওয়া হবে না। নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁওয়ে মহাসড়কে এআই প্রযুক্তিনির্ভর ‘অটো ফাইন সিস্টেম’ উদ্বোধন অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, থ্রি-হুইলার কেবল স্থানীয় বাজার, ফিলিং স্টেশন ও ফিডার রোডে চলাচল করতে পারবে।
নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে মহাসড়কে উঠলে সংশ্লিষ্ট যান ও চালকের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানান তিনি।
এর আগে ২০২৫ সালের আগস্টে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার সিলেটসহ দেশের সব জাতীয় মহাসড়কে থ্রি-হুইলার অটোরিকশা, অটোটেম্পো ও অযান্ত্রিক যানবাহন চলাচল নিষিদ্ধ করে প্রজ্ঞাপন জারি করে। ১ আগস্ট থেকে এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হওয়ার কথা ছিল।
কিন্তু সরকারি নিষেধাজ্ঞা, একের পর এক দুর্ঘটনা এবং মন্ত্রীর কঠোর বক্তব্য কোনোটিই যেন মহাসড়ক থেকে ত্রি-হুইলার সরাতে পারছে না।
ফলে প্রশ্ন উঠছে নিষেধাজ্ঞা যদি কার্যকরই হয়, তাহলে মহাসড়কে এত বিপুল সংখ্যক সিএনজি অটোরিকশা ও টমটম কীভাবে চলছে? কার অনুমতিতে গড়ে উঠছে মহাসড়কের ওপর এসব স্ট্যান্ড? আর নিয়মিত পুলিশি নজরদারির মধ্যেই বা কীভাবে অবাধে চলছে নিষিদ্ধ যান?
এ বিষয়ে শেরপুর হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আনিসুর রহমান রোববার বলেন, ‘সারা বাংলাদেশেই এমনটি চলছে। এটি জাতীয় সমস্যা। সব জায়গাতেই সিএনজি অটোরিকশা চলে।
তিনি জানান, ত্রি-হুইলার বন্ধে নিয়মিত অভিযান ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। তবে এরপরও পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব হয়নি। কার্যক্রম অব্যাহত রাখলে একসময় পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
কিন্তু বাস্তবতা বলছে, ঘোষণা ও নিষেধাজ্ঞার পরও মহাসড়কে ত্রি-হুইলারের দাপট অব্যাহত। আর এসব যানবাহনের অবাধ চলাচলের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে দুর্ঘটনা, প্রাণহানি ও জনদুর্ভোগ।
এখন প্রশ্ন একটাই মহাসড়কে ত্রি-হুইলার বন্ধের ঘোষণা কি শুধু কাগজেই থাকবে, নাকি বাস্তবেও কার্যকর হবে?