নিজস্ব প্রতিবেদক :: সিলেট হযরত শাহজালাল (র.) এর মাজারে সাড়ে ৭শ বছর ধরে চলে আসছে গণ ইফতার। প্রতিবছরই প্রথম রমজান থেকে শুরু হয় এই গণ ইফতার কর্মসূচি। যেখানে এক কাতারে মিলিত হোন ধনী গরিব সবাই। এই গণ ইফতারে প্রতিদিন তিন শতাধিক রোজাদার অংশগ্রহণ করেন।
ইসলামের আলোকবর্তিতা ছড়াতে ৩৬০ সঙ্গী নিয়ে সাড়ে ৭শ বছর আগে সিলেট অঞ্চলে আসেন হযরত শাহজালাল (রহ)। রাজা গৌড় গোবিন্দকে পরাজিত করে ইসলামের পতাকা উড্ডীন করেন তারা। হযরত শাহজালাল ও তার সঙ্গী ৩৬০ আউলিয়ার হাত ধরে এ অঞ্চলে ইসলাম ছড়িয়ে পড়ে। শাহজালাল সিলেটে গড়ে তোলেন আস্তানা। আর সে সময় থেকেই তিনি প্রতি রমজানে ভক্ত আশেকানদের নিয়ে ইফতারের প্রচলন শুরু করেন। যা চলছে আজো। বর্তমানে শাহজালাল মাজারে প্রতিদিন ৩ শতাধিক রোজাদারকে ইফতার করানো হয়। খিচুড়ি বিরিয়ানি থেকে শুরু করে গরুর কিংবা মুরগির মাংস, ছোলা, পেয়াজু, জিলিপী, খেজুরে আপ্যায়িত করা হয়। পেট ভরে ইফতার করতে পেরে রোজাদারও তৃপ্তি প্রকাশ করেন। ভক্ত আশেকানদের দান আর মাজার কর্তৃপক্ষের টাকায় সাড়ে সাতশ’ বছর ধরে চলে আসছে সিলেটের সর্ববৃহৎ এই গণ ইফতার। ভক্তরা রমজানের প্রতিদিনই নামাজ, মাজার জিয়ারত শেষে যোগ দেন গণ ইফতারে। একসাথে গণ ইফতারে অংশ নিয়ে তৃপ্ত হন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা ভক্ত আশেকানরা।
হযরত শাহজালাল (রহ.) মাজার প্রাঙ্গণে প্রতিদিনই বসে এক অনন্য মিলনমেলা। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছুটে আসা শত শত ভক্ত-আশেকান ইফতার সামনে নিয়ে অপেক্ষা করেন মাহে রমজানের পবিত্র মুহূর্তের। ধনী-গরিব নির্বিশেষে সবাই এক কাতারে বসে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য রোজা ভাঙতে প্রস্তুত।
মাগরিবের আজানের অপেক্ষায় থাকা রোজাদারদের মাঝে বিরাজ করছে এক স্বর্গীয় অনুভূতি। মসজিদের মিনারে যখন উচ্চারিত হয় “আল্লাহু আকবার…” ধ্বনি, তখনই সবাই খেজুর কিংবা মিষ্টিজাতীয় খাবার দিয়ে রোজা ভাঙেন। এরপর একসঙ্গে নেওয়া হয় অন্যান্য ইফতার সামগ্রী। এখানে ইফতারের জন্য প্রতিদিন নানা ধরণের খাবার প্রস্তুত করা হয়। স্থানীয় বাসিন্দা থেকে শুরু করে বিভিন্ন সংগঠন ও ব্যক্তিগত উদ্যোগে এই বিশাল ইফতার আয়োজন সম্ভব হয়। সবার জন্য উন্মুক্ত এই ইফতার আয়োজন রমজানের বরকতময় পরিবেশকে আরও মহিমান্বিত করে তোলে।
ভক্ত-আশেকানদের মতে, শাহজালাল (রহ.) মাজারে ইফতার করা শুধু পেটের ক্ষুধা মেটানো নয়, বরং এক আত্মিক প্রশান্তির উৎস। অনেকেই মনে করেন, এই পবিত্র স্থানে ইফতার করার মাধ্যমে তারা আল্লাহর রহমত ও বরকত লাভ করেন। এভাবে বছরের পর বছর ধরে হজরত শাহজালাল (রহ.) মাজারে চলে আসছে গণ ইফতারের এই ঐতিহ্য, যা সিলেটসহ সারা দেশের মানুষের হৃদয়ে এক বিশেষ স্থান করে নিয়েছে।
মাজার কর্তৃপক্ষ জানান, হযরত শাহজালালের মাজারে মানত নিয়ে আসা ভক্তদের সুবিধার জন্যই এ গণ ইফতারের আয়োজন করা হয়। তাদের দান আর মাজার কর্তৃপক্ষের টাকায় চলে আসা এ গণ ইফতারে প্রতিদিন শত শত শত ধনী দরিদ্র এক কাতারে বসে ইফতার করেন।
হযরত শাহজালাল (রহ.) মাজারের খাদেম শামুন মাহমুদ খান বলেন, গণ ইফতারের এ ঐতিহ্য সাড়ে ৭শ বছর ধরে চলে আসছে। হজরত শাহজালাল (রহ.) মাজারে এই ইফতার আয়োজন শুধু একটি খাবার গ্রহণের অনুষ্ঠান নয়, বরং এটি মানবিকতা, সাম্য ও সৌহার্দ্যের এক অনন্য উদাহরণ। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে অসংখ্য মানুষ এখানে ইফতারের অংশ নেন, যা ইসলামের শান্তি ও ভ্রাতৃত্বের বার্তাকে আরও দৃঢ় করে। ধনী দরিদ্র এক কাতারে ইফতারের দৃশ্য মনে করিয়ে দেয় ইসলামে নেই কোনো ভেদাভেদ।
Leave a Reply