পারভেজ আহমদ :::: সিলেটের হযরত শাহজালাল (রহ.) মাজারে জেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে স্থাপন করা নতুন দানবাক্স মাত্র চার দিনে খুলে পাওয়া গেছে নগদ ১৭ লাখ ৫৩ হাজার ৪৬৭ টাকা, পাশাপাশি বিদেশি ডলার, বিভিন্ন দেশের মুদ্রা এবং স্বর্ণালঙ্কার। মাজারের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে দান গণনার ঘটনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার প্রশ্নটি নতুন করে সামনে এসেছে।
সোমবার (২২ জুন) দুপুরে জোহরের নামাজের পর সদ্য প্রত্যাহারকৃত সিলেটের জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. সারওয়ার আলমের উপস্থিতিতে দানবাক্স খোলা হয়। গণনায় অংশ নেন দরগাহ মাদ্রাসার শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। প্রায় চার ঘণ্টা গণনা শেষে নগদ টাকার পাশাপাশি উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ও স্বর্ণালঙ্কার পাওয়া যায়।
গত ১৮ জুন জেলা প্রশাসন শাহজালাল (রহ.) মাজারের তিনটি ঐতিহ্যবাহী দানের ডেগ সিলগালা করে প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে নতুন দানবাক্স স্থাপন করে। দানবাক্সের নিরাপত্তায় আনসার সদস্য মোতায়েন এবং পরে সিসিটিভি ক্যামেরাও স্থাপন করা হয়।
মাজার-সংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যক্তি বলছেন, মাত্র চার দিনের ব্যবধানে এত বিপুল অর্থ, ডলার ও সোনা জমা হওয়ার ঘটনা দীর্ঘদিনের আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। তাদের দাবি, এই হিসাব থেকেই অনুমান করা যায়, বছরের পর বছর ধরে মাজারে আসা দানের কত অর্থ অস্বচ্ছ ব্যবস্থাপনার কারণে হিসাবের বাইরে থেকে গেছে।
মাজার মাদ্রাসার এক শিক্ষক বলেন, “চার দিনের আয় যদি এত হয়, তাহলে দীর্ঘ সময় ধরে কত টাকা এসেছে এবং তার কতটুকুর হিসাব রয়েছে, সেটি তদন্ত করে বের করা প্রয়োজন। যদি কোনো অনিয়ম হয়ে থাকে, তাহলে দায়ীদের আইনের আওতায় আনা উচিত।”
এর আগে জেলা প্রশাসক সারওয়ার আলম প্রকাশ্যে বলেছিলেন, মাজারের আয়-ব্যয়ের কোনো সুসংগঠিত হিসাব প্রশাসনের কাছে উপস্থাপন করা হয়নি। সেই প্রেক্ষাপটে দানবাক্সে তালা, সিসিটিভি নজরদারি এবং প্রকাশ্যে গণনার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
তবে প্রশাসনের এই পদক্ষেপ নিয়ে বিতর্কও তৈরি হয়েছে। শাহজালাল মাজারের মুতাওয়াল্লি ফতেহ উল্লাহ আল আমান দাবি করেন, বিষয়টি আদালতে বিচারাধীন থাকা অবস্থায় পর্যাপ্ত আলোচনা ছাড়াই প্রশাসন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করেছে। অন্যদিকে একদল ভক্ত ও অনুসারী শতাব্দীপ্রাচীন রেওয়াজ পরিবর্তনের অভিযোগ তুলে প্রতিবাদ কর্মসূচিও পালন করেন।
এদিকে দানবাক্স সিলগালা ও আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা আনার উদ্যোগের কয়েক দিনের মধ্যেই জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলমকে প্রত্যাহার করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। রোববার জারি করা আদেশে তাকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে উপসচিব হিসেবে সংযুক্ত করা হয়। তবে প্রত্যাহারের কারণ সম্পর্কে সরকারি আদেশে কিছু উল্লেখ করা হয়নি।
ফলে সিলেটে এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে দুটি বিষয়। একদিকে শাহজালাল (রহ.) মাজারে মাত্র চার দিনে জমা হওয়া বিপুল অঙ্কের টাকা, ডলার ও সোনা; অন্যদিকে দীর্ঘদিনের দান ব্যবস্থাপনা নিয়ে ওঠা প্রশ্ন এবং আর্থিক স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগকে ঘিরে সৃষ্টি হওয়া বিতর্ক।
প্রশাসন জানিয়েছে, উদ্ধার হওয়া অর্থ, বৈদেশিক মুদ্রা ও স্বর্ণালঙ্কার সরকারি বিধি অনুসারে সংরক্ষণ ও পরবর্তী ব্যবস্থাপনার বিষয়ে সিদ্ধান্ত পরে জানানো হবে।
Leave a Reply