কান চলচ্চিত্র উৎসবের অফিসিয়াল প্রতিযোগিতা বিভাগে সাধারণত গভীর জীবনবোধ, রাজনৈতিক দর্শন এবং বুদ্ধিবৃত্তিক ঘরানার সিনেমারই দাপট থাকে। সেখানে হাইওয়েতে পুলিশ কারের রুদ্ধশ্বাস ধাওয়া কিংবা কোনো কর্দমাক্ত দানবের তাণ্ডব দেখার আশা কেউ করেন না। তবে ২০২৬ সালে এই চেনা নিয়মে এক মস্ত বড় ব্যতিক্রম ঘটিয়ে দিয়েছে দক্ষিণ কোরিয়ার একটি ওয়াইল্ড ব্লকবাস্টার। এবারের কান উৎসবে শোরগোল ফেলে দেওয়া এই ছবিটির নাম ‘হোপ’- যা চলতি বছরের ‘মাস্ট-ওয়াচ’ মনস্টার মুভি হিসেবে ইতোমধ্যেই তকমা পেয়ে গেছে।
কোরিয়ান সিনেমার ইতিহাসের অন্যতম ব্যয়বহুল এই সিনেমাটি কেবল একটি সাধারণ দানবের গল্প নয়। বরং আধুনিক ঘরানার ওয়েস্টার্ন, অ্যাকশন থ্রিলার, হরর এবং সায়েন্স ফিকশন মহাকাব্যের এক অবিশ্বাস্য মিশেল। ছবিটির পরতে পরতে রয়েছে ৭০-এর দশকের কাল্ট-মুভিগুলোর মতো চরম উত্তেজনা আর রুদ্ধশ্বাস অনুভূতি। এর চিত্রনাট্যকার ও পরিচালক না হং-জিন দীর্ঘ বিরতির পর ক্যামেরার পেছনে দাঁড়িয়েছেন। ২০১৬ সালে তার সাড়াজাগানো ছবি ‘দ্য ওয়েইলিং’-এর পর সম্ভবত এতদিনের জমানো সব পাগলামি আর আইডিয়া তিনি এই এক সিনেমাতেই ঢেলে দিয়েছেন।
ছবির শুরুতে কোনো ভূমিকা বা প্রেক্ষাপট তৈরির ধার ধারেননি পরিচালক। সত্তোর বা আশির দশকের এক জীর্ণ গ্রামীণ শহর ‘হোপ হারবার’। সেখানকার পুলিশ প্রধানের চরিত্রে অভিনয় করেছেন হোয়াং জং-মিন। পর্দায় তার এন্ট্রির পরপরই একদল শিকারি এসে খবর দেয়, অদ্ভুত ও গভীর নখের আঁচড়সহ একটি গরুর মৃতদেহ পাওয়া গেছে। বাঘ কিংবা ভালুকের খোঁজে পুলিশ প্রধান যখন তদন্তে নামেন, তখনই গল্প রূপ নেয় এক ভিন্ন মাত্রায়- যা দর্শককে গডজিলা কিংবা জম্বি অ্যাপোক্যালিপ্সের আমেজ দেবে। শহরে এক ভয়ঙ্কর দানব দাপিয়ে বেড়াচ্ছে, আর পুলিশ অফিসার তার পেছনে ছুটছেন।
সিনেমার প্রথম এক ঘণ্টা যেন এক নিঃশ্বাস বন্ধ করা রোলারকোস্টার রাইড। এখানে কোনো কান্নাকাটি করা পরিবার বা ল্যাবরেটরিতে ব্যস্ত বিজ্ঞানীদের দেখিয়ে সময় নষ্ট করা হয়নি। পর্দায় শুধু আছে বুলেট, গাড়ির টায়ারের শব্দ আর অ্যাড্রেনালিন রাশ! হলিউডি সিনেমার মতো এখানে পুলিশ প্রধানকে অতিমানব বানানো হয়নি, বরং ক্লিন্ট ইস্টউডের মতো রাফ অ্যান্ড টাফ এই আইনরক্ষক নিজেও যে দানবের ভয়ে কাঁপতে পারেন, তা দারুণভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। আর সবচেয়ে প্রশংসনীয় বিষয় হলো, প্রথম ৪০ মিনিট পরিচালক সেই রহস্যময় দানবটিকে পর্দায় দেখানইনি, যা দর্শকের কৌতুহলকে চরমে নিয়ে যায়।
তবে ৪০ মিনিট পর যখন দানবটি অবশেষে পর্দায় হাজির হয়, তখন কিছুটা হতাশ হতে পারেন দর্শক। দুর্বল সিজিআই-এর কারণে কিছু কিছু দৃশ্যকে ভিডিও গেমের মতো মনে হয়েছে। কিন্তু সেই দুর্বলতা ঢেকে দিয়েছে এর দুর্দান্ত লাইভ-অ্যাকশন আর শ্বাসরুদ্ধকর স্ট্যান্ট। অস্কারে স্ট্যান্ট ডিজাইনের জন্য যে নতুন পুরস্কার চালু হতে যাচ্ছে, তা যদি ২০২৮ সালের আগে দেওয়া সম্ভব হতো, তবে এই ছবির দুর্দান্ত ড্রাইভিং এবং ঘোড়সওয়ারির রোমহর্ষক দৃশ্যগুলো অনায়াসেই সেই মনোনয়ন কেড়ে নিত।
দানবটির খোঁজে বনে যাওয়ার পর পুলিশ প্রধানের সাথে যোগ দেন তার ডানপিটে চাচাতো ভাই (জো ইন-সাং) এবং স্কুইড গেম খ্যাত জং হো-ইয়ন। এছাড়া হলিউড তারকা মাইকেল ফাসবেন্ডার এবং আলিসিয়া ভিকান্দারের ক্যামিও চরিত্রগুলো ছবিতে এক ভিন্ন চমক যোগ করেছে।
পরিচালক না হং-জিন যে আর্নল্ড শোয়ার্জনেগার এবং জেমস ক্যামেরনের অন্ধ ভক্ত, তা সিনেমাটি দেখলেই স্পষ্ট বোঝা যায়। ‘দ্য টার্মিনেটর’, ‘প্রিডেটর’, ‘অ্যালিয়েনস’ এবং ‘অ্যাভাটার’-এর মতো কালজয়ী সিনেমাগুলোর ছায়া রয়েছে এই ছবিতে। তবে হলিউডকে হুবহু নকল না করে পরিচালক এতে নিজস্ব রসবোধ, মানুষের দুর্বলতা এবং কুসংস্কারের মতো সামাজিক দিকগুলো ফুটিয়ে তুলেছেন। তাই কেবল মারপিটই নয়, কান চলচ্চিত্রের উপযোগী গভীরতা আর রাজনৈতিক বার্তা- সবই আছে ‘হোপ’-এ।
আড়াই ঘণ্টার এই দীর্ঘ ও ক্লান্তিকর যাত্রার পর সিনেমাটি যখন হঠাৎ শেষ হয়, তখন মনে হবে গল্পের আরও অন্তত এক ঘণ্টা বাকি রয়ে গেছে। তবে এটি হয়তো ইঙ্গিত দিচ্ছে, খুব শীঘ্রই এর সিক্যুয়েল আসতে চলেছে। আশা করা যায়, পরের পর্বের জন্য দর্শকদের আর এক দশক অপেক্ষা করতে হবে না।
Leave a Reply