ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ আলি খামেনির শেষ বিদায় অনুষ্ঠানের আনুষ্ঠানিকতা কেবল শোকের রঙে সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং এই আয়োজনে কোরআনের আয়াত নির্বাচনের মাধ্যমে ইরান বিশ্বনেতাদের কাছে এক সুগভীর কূটনৈতিক বার্তা পৌঁছে দিয়েছে। তেহরানের ইমাম খোমেনি গ্র্যান্ড মোসাল্লায় সমবেত প্রতিনিধিদলগুলোর সামনে পাঠ করা প্রতিটি আয়াত যেন একেকটি প্রতীকী সংকেত— যা একদিকে মিত্রদের প্রতি সমর্থন, অন্যদিকে প্রতিদ্বন্দ্বীদের জন্য কঠোর সতর্কবার্তা।
সবচেয়ে বেশি আলোচনার জন্ম দিয়েছে সৌদি প্রতিনিধিদলকে সামনে রেখে পাঠ করা সূরা আল-ইমরানের ১৩ নম্বর আয়াতটি। এই আয়াতে বদর যুদ্ধের ঘটনাপ্রবাহ বর্ণিত হয়েছে, যেখানে মুসলিম বাহিনী সংখ্যায় অনেক কম ও দুর্বল সরঞ্জাম নিয়ে প্রবল শক্তিশালী শত্রুকে পরাজিত করেছিল। বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধজয়ী ইরানের পক্ষ থেকে এটি ছিল একাধারে অভিনন্দন ও তাচ্ছিল্যের সংমিশ্রণ। রিয়াদ যুদ্ধের সময় কার্যত নিষ্ক্রিয় ছিল এবং কিছু প্রতিবেদনে অভিযোগ উঠেছে, তারা গোপনে ইরানের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল। আয়াতটি নির্বাচনের মাধ্যমে তেহরান সম্ভবত রিয়াদের কাছে বুঝিয়ে দিয়েছে, ইরানের বিজয় কোনো বাহ্যিক শক্তির ওপর নির্ভর করেনি, বরং তা ছিল ‘ঐশ্বরিক ইচ্ছায়’ অর্জিত।
ইরানের ‘এক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স’ বা প্রতিরোধ অক্ষের শরিকদের জন্য বাছাই করা আয়াতগুলোতে ছিল লড়াই, ত্যাগ ও বিজয়ের উদ্দীপনা। ফিলিস্তিনি হামাসকে শোনানো হয়েছে সেই অঙ্গীকারের আয়াত, যেখানে আল্লাহর পথে নিজেদের ওয়াদা পূরণের কথা বলা হয়েছে। হিজবুল্লাহর জন্য নির্বাচন করা হয়েছে যুদ্ধের ময়দানে ‘উপরি হাত’ বা শ্রেষ্ঠত্বের নিশ্চয়তা সম্বলিত আয়াত। তালিবান এবং ফিলিস্তিনি ইসলামিক জিহাদকে শোনানো হয়েছে ‘ফাতহ’ বা স্পষ্ট বিজয়ের ঘোষণা। এই আয়াত নির্বাচনের মাধ্যমে তেহরান স্পষ্ট করে দিয়েছে, তারা তালেবানের আমেরিকার বিরুদ্ধে জয়কে ফিলিস্তিনিদের জন্য একটি অনুপ্রেরণা হিসেবে দেখছে।
অন্যদিকে, রাশিয়া, চীন ও ভারতের মতো বড় রাষ্ট্রগুলোর সামনে পাঠ করা আয়াতগুলো ছিল যুদ্ধের নয়, বরং আধ্যাত্মিক প্রশান্তি ও ন্যায়পরায়ণতার। রাশিয়ার জন্য নির্বাচিত হয়েছে ‘পরকালের চিরস্থায়ী আবাস’-এর কথা। চীনের জন্য পাঠ করা হয়েছে, ‘বিজয় কেবল আল্লাহর পক্ষ থেকেই আসে’- এমন একটি আশ্বস্তকারী বাণী। এই রাষ্ট্রগুলোকে ইরান তাদের মিত্র হিসেবে শ্রদ্ধা জানালেও, তাদের কোনোভাবেই এই আদর্শিক বা সশস্ত্র লড়াইয়ের অংশীদার হিসেবে খামেনির দাফন প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত করতে চায়নি।
ইরান কেবল মিত্রদের প্রশংসা করেনি, বরং প্রয়োজনে কড়া ভাষাও ব্যবহার করেছে। লেবাননের রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধিদের সামনে পাঠ করা হয়েছে সূরা নিসার ৬৬ নম্বর আয়াতটি। এই আয়াতে সেইসব মানুষের প্রতি ভর্ৎসনা করা হয়েছে, যারা প্রয়োজনে ত্যাগ স্বীকার করতে বা ঘরবাড়ি ছাড়তে দ্বিধাগ্রস্ত থাকে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি লেবানন সরকারের প্রতি ইরানের এক সরাসরি ভর্ৎসনা যারা ইসরায়েলি আগ্রাসন প্রতিরোধে হিজবুল্লাহর মতো ভূমিকা নিতে ব্যর্থ হয়েছে বলে তেহরান মনে করে।
Leave a Reply