সবসময় ডেস্ক ::রোববার সকালেও তারা ছিলেন একসঙ্গে। একই শ্রেণিকক্ষে বসে দিয়েছেন পরীক্ষা, দিয়েছেন অন্যান্য সহপাঠীদের সাথে আড্ডা, গল্প করেছেন ভবিষ্যৎ নিয়ে। কেউ ভাবতেই পারেনি, কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে তাদের জীবন এমন করুণ পরিণতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হওয়ার পর প্রথমে মারা যায় সাকিব আহমদ (১৬)। সেই মৃত্যুর শোক কাটিয়ে ওঠার আগেই একে একে নিভে যায় তার দুই বন্ধু রায়হান আহমেদ (রাহুল) ও জয় আহমদের জীবনও। তিনজনই ছিল সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার জাফলং আমির মিয়া হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজের অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী।
রোববার গোয়াইনঘাট-জাফলং সড়কের জাফলং চা-বাগান এলাকায় মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় তারা গুরুতর আহত হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় প্রথমে সাকিবের মৃত্যু হয়। পরে পৃথক সময়ে মারা যায় রায়হান ও জয়। সোমবার পৃথক জানাজা শেষে তিন বন্ধুকে নিজ নিজ এলাকার সামাজিক কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে।
স্বজনরা জানান, ষষ্ঠ শ্রেণি থেকেই তিনজনের বন্ধুত্ব। স্কুলে যাওয়া, খেলাধুলা, ঘুরতে বের হওয়া—প্রায় সব সময়ই তারা একসঙ্গে থাকত। দুর্ঘটনার দিনও তারা একসঙ্গে পরীক্ষা দিয়ে বের হয়েছিল। সেই পথচলাই শেষ পর্যন্ত তাদের জীবনের শেষ যাত্রায় পরিণত হয়।
সাকিবের বাবা মহরম মিয়া বলেন, ‘আমার ছেলে খুব শান্ত-স্বভাবের ছিল। তাকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন ছিল। আল্লাহ আমার বুকটাই খালি করে দিলেন। বাবার কাঁধে সন্তানের লাশ যে কত ভারী, তা যার সন্তান হারিয়েছে, সেই শুধু বুঝবে।’
রায়হানের বাবা হাবিবুর রহমান (হবি) মিয়া বলেন, ‘সাকিবের মৃত্যুর খবরেই আমরা ভেঙে পড়েছিলাম। তখনও আশা ছিল আমার ছেলেটা হয়তো ফিরে আসবে। কিন্তু কিছুক্ষণ পর সেই আশাটাও শেষ হয়ে গেল। সকালে পরীক্ষা দিতে বের হওয়া ছেলেটা আর জীবিত ফিরল না।’
জয়ের বাবা রাজ্জাক মিয়া বলেন, ‘তিন বন্ধু সব সময় একসঙ্গে চলাফেরা করত। কখনো ভাবিনি, আল্লাহ ওদেরও একসঙ্গে নিয়ে যাবেন। এখন তিনটি পরিবার একই শোক বয়ে বেড়াচ্ছে।’
সোমবার ছিল গোয়াইনঘাটের মানুষের জন্য এক বেদনাময় দিন। একের পর এক জানাজায় ভিড় করেন স্বজন, সহপাঠী, শিক্ষক ও স্থানীয় বাসিন্দারা। কারও চোখে অশ্রু থামেনি। তিন বন্ধুকে শেষ বিদায় জানাতে গিয়ে অনেকেই আবেগ ধরে রাখতে পারেননি।
জাফলং আমির মিয়া হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা জানান, সাকিব, রায়হান ও জয়—তিনজনই ছিল প্রাণবন্ত ও সবার প্রিয়। কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে তিন সহপাঠীকে হারানোর শোক এখনো তারা কাটিয়ে উঠতে পারেনি। শ্রেণিকক্ষের তিনটি বেঞ্চ এখন তাদের শূন্যতার কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে।
স্থানীয়রা জানান, গোয়াইনঘাটসহ সীমান্তবর্তী এলাকায় অপ্রাপ্তবয়স্কদের মোটরসাইকেল চালানোর প্রবণতা উদ্বেগজনক। অনেকেই ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়াই মোটরসাইকেল চালায়। ফলে প্রায়ই প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা ঘটছে।
গোয়াইনঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রতন কুমার অধিকারী বলেন, ঘটনাটি অত্যন্ত মর্মান্তিক। অভিভাবকদের আরও সচেতন হতে হবে। অপ্রাপ্তবয়স্কদের হাতে মোটরসাইকেল তুলে দেওয়া এবং লাইসেন্সবিহীন ও ফিটনেসবিহীন যানবাহন চলাচলের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অপ্রাপ্তবয়স্ক শিক্ষার্থীরা যাতে মোটরসাইকেল নিয়ে প্রবেশ করতে না পারে, সে বিষয়েও নজরদারি বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
Leave a Reply