স্টাফ রিপোর্টার ::: সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার দেশের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র বিছনাকান্দি এবং সীমান্তবর্তী হাদারপাড় বালু মহালকে ঘিরে চলছে পাথর ও বালু উত্তোলনের নামে ভয়াবহ লুটপাটের অভিযোগ। সরকারি ইজারার শর্ত, পরিবেশ সংরক্ষণ আইন এবং নির্ধারিত সীমানা উপেক্ষা করে দিন-রাত অবাধে ড্রেজার মেশিন ও শত শত ট্রলারের মাধ্যমে পাথর-বালু উত্তোলন করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয়দের দাবি, এ অবৈধ কর্মকাণ্ডে নদীর তলদেশ ধ্বংস হচ্ছে, বাড়ছে নদীভাঙন, ঝুঁকিতে পড়েছে বসতভিটা, কৃষিজমি, বাজার এবং দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটন এলাকা বিছনাকান্দির প্রাকৃতিক সৌন্দর্য।
স্থানীয় একাধিক সূত্র জানায়, গোয়াইনঘাট উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও বিএনপি নেতা শাহ আলম স্বপন এবং উপজেলা তাতীদলের নেতা আব্দুল মান্নানের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন ধরে এ কার্যক্রম পরিচালনা করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, হাদারপাড় বালু মহালের ইজারা নেওয়া হলেও সেই অনুমতির আড়ালে ইজারাবহির্ভূত বিছনাকান্দি সীমান্ত এলাকা, মনরতল বাজারসংলগ্ন নদী এবং সংরক্ষিত বিভিন্ন স্থান থেকেও নির্বিচারে পাথর ও বালু উত্তোলন করা হচ্ছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রতিদিন ভোর হওয়ার আগেই নদীতে নামে শত শত ট্রলার। একই সঙ্গে একাধিক উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ড্রেজার বা ‘বোমা মেশিন’ দিয়ে নদীর তলদেশ গভীরভাবে কেটে পাথর ও বালু তোলা হয়। এই কার্যক্রম চলে গভীর রাত পর্যন্ত। এতে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি নদীর গতিপথেও পরিবর্তনের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, নদীর তলদেশ ক্রমাগত গভীর করে কাটার ফলে বিভিন্ন স্থানে ভয়াবহ নদীভাঙন দেখা দিয়েছে। অনেক কৃষিজমি ইতোমধ্যে ঝুঁকির মুখে পড়েছে। বসতবাড়ি এবং ঐতিহ্যবাহী মনরতল বাজারও হুমকির মুখে রয়েছে। তারা আশঙ্কা করছেন, দ্রুত এই কার্যক্রম বন্ধ না হলে ভবিষ্যতে বড় ধরনের পরিবেশগত ও মানবিক বিপর্যয় দেখা দিতে পারে।
পর্যটননির্ভর স্থানীয় অর্থনীতিও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। বিছনাকান্দি প্রতিবছর লাখো পর্যটকের পদচারণায় মুখর থাকে। পাহাড়ঘেরা স্বচ্ছ পানির নদী, পাথরের বিস্তীর্ণ স্তর এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য এটি দেশজুড়ে পরিচিত। কিন্তু অবাধ ড্রেজিং ও পাথর উত্তোলনের কারণে নদীর স্বাভাবিক সৌন্দর্য নষ্ট হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও পর্যটনসংশ্লিষ্টরা।
পরিবেশ সচেতন ব্যক্তিদের মতে, নদীর তলদেশে অনিয়ন্ত্রিত ড্রেজিং অব্যাহত থাকলে শুধু বিছনাকান্দিই নয়, পুরো এলাকার জীববৈচিত্র্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে। নদীর স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্ট হলে মাছসহ জলজ প্রাণীর আবাস ধ্বংস হবে এবং দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব পড়বে স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকার ওপর।
অভিযোগ রয়েছে, গোয়াইনঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ওমর ফারুক এবং সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নের দায়িত্বে থাকা কয়েকজন সাব-ইন্সপেক্টরকে ‘ম্যানেজ’ করেই সিন্ডিকেটটি নির্বিঘ্নে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। স্থানীয়দের দাবি, একের পর এক লিখিত ও মৌখিক অভিযোগ, গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনা হলেও দৃশ্যমান কোনো অভিযান পরিচালিত হয়নি। ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে, গোয়াইনঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রতন কুমার অধিকারী, সংশ্লিষ্ট প্রশাসন এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের কার্যকর পদক্ষেপ না থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা। তাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে প্রকাশ্যে এ কার্যক্রম চললেও সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর পক্ষ থেকে উল্লেখযোগ্য কোনো অভিযান বা প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা দেখা যায়নি।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান শাহ আলম স্বপন প্রথমে অভিযোগ অস্বীকার করেন। পরে তিনি বলেন, “আব্দুল মান্নান ইজারা নিয়েছেন। বালু মহালের নির্ধারিত সীমানার ভেতরেই বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। সীমানার বাইরে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
এদিকে অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে গোয়াইনঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ওমর ফারুকের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে এ বিষয়ে তাঁর বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।
স্থানীয়দের দাবি, অবিলম্বে অবৈধ ড্রেজার মেশিন জব্দ, ইজারার শর্ত লঙ্ঘনের নিরপেক্ষ তদন্ত, ইজারাবহির্ভূত এলাকায় পাথর ও বালু উত্তোলন বন্ধ এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে বিছনাকান্দির পরিবেশ, নদী, কৃষিজমি এবং পর্যটন এলাকা রক্ষায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পরিবেশ অধিদপ্তর, জেলা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার সমন্বিত অভিযান পরিচালনার জোর দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী এলাকাবাসী।
তাদের ভাষ্য, সময়মতো কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই পর্যটনকেন্দ্র এবং সীমান্তঘেঁষা নদীভিত্তিক প্রাকৃতিক পরিবেশ অপূরণীয় ক্ষতির মুখে পড়বে।
Leave a Reply