অভিযোগ আরও গুরুতর নিয়ম-কানুনের পরিবর্তে কথিত ‘টোকেন’ই নাকি এসব যানবাহনের চলাচলের প্রধান ঢাল। নির্দিষ্ট অঙ্কের মাসোহারা কিংবা টোকেনের বিনিময়ে ট্রাফিক আইন ভাঙার সুযোগ তৈরি হচ্ছে কি না, তা নিয়ে নগরবাসীর মধ্যে প্রশ্ন ক্রমেই জোরালো হচ্ছে।
‘টোকেন’ দেখালেই কি আইন অকার্যকর?
সিলেটের পরিবহন খাতে দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত ‘টোকেন-বাণিজ্য’ নিয়ে রয়েছে নানা অভিযোগ। কথিত এই টোকেনকে ঘিরে যদি সত্যিই কোনো অবৈধ লেনদেন হয়ে থাকে, তাহলে প্রশ্ন হলো কারা এর সঙ্গে জড়িত? কারা এই অর্থ সংগ্রহ করছে? কোথায় যাচ্ছে সেই টাকা? আর প্রশাসনের চোখের সামনে বছরের পর বছর কীভাবে এমন ব্যবস্থা টিকে আছে?
অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সচেতন নাগরিকরা। কারণ একটি টোকেন যদি বৈধ কাগজপত্রের বিকল্প হয়ে যায়, তাহলে সড়ক পরিবহন ব্যবস্থায় আইনের প্রয়োজনই বা কোথায়?
রাস্তার ওপরই গড়ে উঠেছে অবৈধ স্ট্যান্ড
সরেজমিনে নগরীর বিভিন্ন সড়ক ঘুরে দেখা গেছে, জেলরোড থেকে ওসমানী উদ্যানের আশপাশ, কোর্ট পয়েন্ট, বটেশ্বর বাজার, পীরের বাজার, জিন্দাবাজার, টিলাগড় পয়েন্টসহ গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় যত্রতত্র লেগুনা দাঁড় করিয়ে যাত্রী ওঠানামা করানো হচ্ছে। কোথাও সড়কের একাংশ দখল করে তৈরি হয়েছে অস্থায়ী স্ট্যান্ড, কোথাও আবার ব্যস্ত মোড়েই চলছে যাত্রী তোলার প্রতিযোগিতা।
ফলে স্বাভাবিক যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। কয়েক মিনিটের জন্য একটি লেগুনা রাস্তার মাঝখানে দাঁড়ালেই পেছনে তৈরি হচ্ছে দীর্ঘ যানজট। একে অপরকে টপকে যাত্রী তুলতে গিয়ে চালকদের মধ্যে চলছে অসুস্থ প্রতিযোগিতা। আর এর খেসারত দিচ্ছেন সাধারণ যাত্রী, পথচারী ও বৈধ যানবাহনের চালকরা।
রশিদে চাঁদা, বিনিময়ে কী?
‘সিলেট জেলা হিউম্যান হলার চালক শ্রমিক ইউনিয়ন’-এর নামে রশিদ দিয়ে লেগুনা থেকে নিয়মিত অর্থ আদায়ের অভিযোগও রয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে এই অর্থ আদায়ের বৈধতা কতটুকু? সংগঠনের নামে টাকা নেওয়া হলে তার হিসাব কোথায়? চালকদের জন্য কী ধরনের সেবা দেওয়া হয়? এবং এই অর্থ আদায়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোনো অনুমোদন রয়েছে কি না এসব বিষয়ও খতিয়ে দেখা জরুরি।
বিশেষ করে তামাবিল মহাসড়কের জৈন্তাপুর থেকে টিলাগড় হয়ে বন্দরবাজার রুটে লেগুনার আধিক্য সবচেয়ে বেশি বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। এই রুটে যাত্রী তুলতে গিয়ে প্রায়ই চালকদের মধ্যে প্রতিযোগিতা তৈরি হয়। এক লেগুনা আরেকটিকে পেছনে ফেলতে গিয়ে বেপরোয়া গতিতে ছুটে চলে। ঝুঁকিতে পড়েন যাত্রীরা।
শিশু-কিশোর চালকের অভিযোগে বাড়ছে উদ্বেগ
সবচেয়ে ভয়াবহ অভিযোগগুলোর একটি হলো অপরিণত বয়সী শিশু-কিশোর ও লাইসেন্সবিহীন চালকদের হাতে লেগুনার স্টিয়ারিং থাকার অভিযোগ। যদি এই অভিযোগ সত্য হয়, তাহলে বিষয়টি শুধু ট্রাফিক আইন ভঙ্গ নয়; এটি সরাসরি জননিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি।
অতিরিক্ত যাত্রী বোঝাই, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং, বেপরোয়া গতি এবং যেখানে-সেখানে যাত্রী ওঠানামা সব মিলিয়ে লেগুনাগুলো অনেক সময় চলন্ত মৃত্যুফাঁদে পরিণত হচ্ছে বলে অভিযোগ করছেন যাত্রীরা।
বিশেষ করে তামাবিল মহাসড়কে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক যাত্রী চলাচল করেন। এই সড়কে সামান্য অসতর্কতাও বড় দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে। অথচ নিয়মিত নজরদারি ও কঠোর অভিযান থাকা সত্ত্বেও একই চিত্র বারবার ফিরে আসছে।
দুই বছরে ৭৩৯ প্রাণহানি তবু শিক্ষা নেই?
সিলেট বিভাগে গত দুই বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় ৭৩৯ জনের প্রাণহানির তথ্য সামনে এসেছে। প্রতিটি মৃত্যু একটি পরিবারের স্বপ্নকে ভেঙে দেয়। একজন বাবা হারান সন্তানকে, কোনো সন্তান হারায় বাবা-মাকে, কোনো পরিবার হারায় উপার্জনক্ষম সদস্যকে।
সড়ক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, ফিটনেসবিহীন যান, অদক্ষ চালক, অতিরিক্ত গতি, ট্রাফিক আইন না মানা এবং অব্যবস্থাপনা এসবই দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ায়। তাহলে এত প্রাণহানির পরও যদি অবৈধ যানবাহন ও অদক্ষ চালকদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তবে আর কত প্রাণ গেলে প্রশাসনের টনক নড়বে?
বিআরটিএর হিসাবে ২,১০৪ রাজপথে যেন তার বহুগুণ!
বিআরটিএর দাপ্তরিক তথ্য অনুযায়ী, সিলেট নগরীতে বৈধভাবে নিবন্ধিত লেগুনার সংখ্যা ২ হাজার ১০৪টি। কিন্তু নগরীর বিভিন্ন সড়কে চলাচলরত লেগুনার সংখ্যা দেখলে বাস্তব চিত্র নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়।
যদি নিবন্ধিত যানবাহনের বাইরে বিপুলসংখ্যক লেগুনা সত্যিই রাস্তায় চলাচল করে থাকে, তাহলে সেগুলো কারা চালাচ্ছে? কোথা থেকে এসেছে? তাদের কাগজপত্র কোথায়? ফিটনেস আছে কি না? চালকের লাইসেন্স আছে কি না? রুট পারমিট রয়েছে কি না?
আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন নিয়মিত অভিযান ও চেকপোস্টের পরও এসব যান কীভাবে প্রতিদিন নগরীর গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে নির্বিঘ্নে চলাচল করছে?
অভিযান হয়, মামলা হয় কিন্তু বন্ধ হয় না অবৈধতা
বিআরটিএ ও ট্রাফিক পুলিশের পক্ষ থেকে নিয়মিত অভিযান, মামলা ও ডাম্পিংয়ের কথা বলা হলেও নগরীর বাস্তব চিত্রে তার স্থায়ী প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না বলে অভিযোগ নগরবাসীর।
কয়েকদিন অভিযান, এরপর আবার আগের চিত্র এভাবেই যদি চলতে থাকে, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই, এসব অভিযান কি সমস্যার সমাধান করছে, নাকি কেবল সাময়িকভাবে পরিস্থিতি সামাল দিচ্ছে?
অভিযানের পরও একই গাড়ি, একই চালক, একই স্ট্যান্ড এবং একই রুটে আবার অবৈধভাবে যান চলাচল শুরু করলে কার্যকর ব্যবস্থা কোথায় এ প্রশ্নের জবাব প্রয়োজন।
বৈধ ব্যবসায়ীরা কেন হতাশ?
পরিবহন খাতের বৈধ ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, নিয়ম মেনে গাড়ি পরিচালনা করতে গিয়ে তাদের নানা ধরনের কাগজপত্র, ফি, কর ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। অথচ একই রাস্তায় কথিত অবৈধ যান যদি কোনো ধরনের বাধা ছাড়াই চলাচল করতে পারে, তাহলে বৈধভাবে ব্যবসা করার উৎসাহই বা থাকবে কেন?
এই বৈষম্য শুধু বৈধ ব্যবসায়ীদের ক্ষতিগ্রস্ত করছে না, বরং রাষ্ট্রের রাজস্ব ব্যবস্থাকেও প্রশ্নের মুখে ফেলছে।
একজন বৈধ পরিবহন মালিক যদি নিয়ম মেনে চলেও হয়রানির শিকার হন, আর অন্যদিকে অবৈধ যান কথিত টোকেনের জোরে নির্বিঘ্নে চলাচল করে তাহলে এটি আইনের শাসনের জন্য ভয়াবহ বার্তা।
প্রশ্ন এখন প্রশাসনের কাছে
কীভাবে বছরের পর বছর গুরুত্বপূর্ণ সড়কের অংশ দখল করে অবৈধ স্ট্যান্ড টিকে থাকে?
কীভাবে ফিটনেসবিহীন ও কাগজপত্রহীন যানবাহন নিয়মিত নগরীর সড়কে চলাচল করে?
কীভাবে লাইসেন্সবিহীন কিংবা অপ্রাপ্তবয়স্ক চালকদের হাতে গণপরিবহনের স্টিয়ারিং থাকে?
কারা রশিদ দিয়ে অর্থ আদায় করছে?
এই অর্থের হিসাব কোথায়?
‘টোকেন’ নামে কোনো অর্থ আদায় হলে তার সঙ্গে কারা জড়িত?
ট্রাফিক পুলিশের নাম ব্যবহার করে কেউ অবৈধ অর্থ আদায় করলে তাদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে?
আর যদি ‘টোকেন-বাণিজ্য’-এর অভিযোগ সত্য না হয়, তাহলে প্রশাসন প্রকাশ্যে তদন্ত করে অভিযোগের সত্যতা জনগণের সামনে তুলে ধরছে না কেন?
সড়ক কি মানুষের, নাকি সিন্ডিকেটের?
সিলেটের রাজপথ কোনো পরিবহন সিন্ডিকেটের ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। এটি সাধারণ মানুষের চলাচলের জায়গা। প্রতিটি নাগরিকের নিরাপদে চলাচলের অধিকার রয়েছে। কিন্তু অবৈধ স্ট্যান্ড, বেপরোয়া লেগুনা, লাইসেন্সবিহীন চালক, অতিরিক্ত যাত্রী এবং কথিত চাঁদাবাজির অভিযোগ সব মিলিয়ে নগরীর সড়ক ব্যবস্থাপনা এখন বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে।
তাই শুধু লোক দেখানো অভিযান নয় প্রয়োজন দৃশ্যমান, ধারাবাহিক ও নিরপেক্ষ অভিযান।
প্রয়োজন অবৈধ স্ট্যান্ড উচ্ছেদ, ফিটনেসবিহীন যান জব্দ, লাইসেন্সবিহীন চালকদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা এবং কথিত ‘টোকেন-বাণিজ্য’-এর অভিযোগের স্বাধীন তদন্ত।
কারণ কোনো টোকেন, কোনো রশিদ কিংবা কোনো সিন্ডিকেটের ক্ষমতা একজন মানুষের জীবনের চেয়ে বড় হতে পারে না।
সিলেটের সড়কে আরেকটি প্রাণহানি ঘটার আগেই ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রশাসনের এখন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় রাজপথ কি আইনের অধীনে থাকবে, নাকি ‘টোকেন’ ও সিন্ডিকেটের দখলেই চলবে?