গাজায় হাসপাতাল ও চিকিৎসাকেন্দ্রে হামলার খবর হয়তো আগের মতো প্রতিদিনের শিরোনাম হচ্ছে না। কিন্তু তাতে এই উপত্যকাটির স্বাস্থ্যসংকট কমেনি। বরং হাসপাতাল ও চিকিৎসাকেন্দ্রের ধ্বংস, চিকিৎসা সরঞ্জামের ঘাটতি, ওষুধের সংকট এবং লাখো মানুষের বাস্তুচ্যুতির কারণে গাজার স্বাস্থ্যব্যবস্থা ক্রমেই ভঙ্গুর হয়ে পড়ছে।
সবচেয়ে বেশি সংকটে রয়েছেন বাস্তুচ্যুত শিবিরের বাসিন্দারা। একদিকে বিধ্বস্ত স্বাস্থ্যব্যবস্থা তাদের কাছে পৌঁছাতে পারছে না, অন্যদিকে অসুস্থ ও আহত মানুষের পক্ষেও সীমিতসংখ্যক সচল স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পৌঁছানো কঠিন হয়ে উঠেছে। নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশনের সংকট, তীব্র গরম-ঠান্ডা এবং অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
সম্প্রতি গাজা শহরের নাসর মহল্লায় হাসান সালামা স্কুলের ধ্বংসাবশেষের পাশে গড়ে ওঠা একটি অস্থায়ী শিবিরে এক দিনের চিকিৎসা কার্যক্রম চালান স্থানীয় একটি বেসরকারি ক্লিনিকের কয়েকজন চিকিৎসক। যুদ্ধের কারণে গৃহহীন হয়ে পড়া শত শত মানুষ সেখানে তাবু ও স্কুল ভবনের অবশিষ্ট অংশে বসবাস করছেন।
এক দিনের ওই কার্যক্রমে অন্তত ১৫০ রোগীকে চিকিৎসা দেওয়া হয়। তাদের মধ্যে উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও কিডনি রোগের মতো দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতার পাশাপাশি হেপাটাইটিস ও খোসপাঁচড়ার মতো সংক্রমণও ছিল। শিশুদের মধ্যে দেখা গেছে জলবসন্ত, গ্যাস্ট্রোএন্টেরাইটিস, ডায়রিয়া ও শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ।
চিকিৎসাসেবা ছিল প্রাথমিক পর্যায়ের। তবু চিকিৎসকদের প্রতি রোগীদের কৃতজ্ঞতা ছিল গভীর। কারণ বাস্তুচ্যুত শিবিরে বসবাসকারী অনেক মানুষের কাছে একজন চিকিৎসকের কাছে পৌঁছানোই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
চিকিৎসা নিতে গেলেও বড় বাধা খরচ
বাস্তুচ্যুত মানুষের জন্য দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়া, যাতায়াতের খরচ এবং প্রচণ্ড গরমে শারীরিক ক্লান্তি চিকিৎসা নেওয়ার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে জরুরি প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও অনেকে চিকিৎসা নিতে দেরি করছেন।
৪৬ বছর বয়সী এক রোগীর পরিস্থিতিই এর উদাহরণ। শ্র্যাপনেলের আঘাতে তার পা গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। চলাচলের জন্য তাকে ক্রাচ ব্যবহার করতে হয়। একই সঙ্গে রয়েছে উচ্চ রক্তচাপের সমস্যা।
কাছাকাছি আল-রানতিসি হাসপাতালে যাওয়া তার জন্য সহজ নয়। হাসপাতালটি আংশিকভাবে চালু এবং মূলত শিশু ও ক্যানসার রোগীদের চিকিৎসা দিচ্ছে। অন্য হাসপাতালে যেতে হলে তাকে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হবে। অথচ কাছের স্বাস্থ্যকেন্দ্রে বিনামূল্যে রক্তচাপ পরীক্ষা ও ওষুধের ব্যবস্থাপত্র নিতে গেলেও যাতায়াতেই অন্তত ৮ ডলার খরচ করতে হবে।
যারা প্রতিদিনের খাবার জোগাড় করতেই হিমশিম খাচ্ছেন, তাদের জন্য এই অর্থও বড় বোঝা। ফলে চিকিৎসা পাওয়ার অধিকার ক্রমেই আর্থিক সামর্থ্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে।
ধ্বংসস্তূপে সংকুচিত স্বাস্থ্যব্যবস্থা
গাজার স্বাস্থ্যব্যবস্থার সংকটের গভীরতা বোঝা যায় হাসপাতাল ও শয্যার পরিসংখ্যানেও। যুদ্ধের আগে গাজা উপত্যকাজুড়ে ইউএনআরডব্লিউএ ২২টি ক্লিনিক পরিচালনা করত। সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে এর মাত্র ছয়টি চালু রয়েছে।
গাজার ৩৪টি হাসপাতালের মধ্যে মাত্র ১৯টি আংশিকভাবে কার্যকর। তবে ‘আংশিকভাবে কার্যকর’ থাকার অর্থ পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসাসেবা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। ব্যাপক ধ্বংসের কারণে হাসপাতালের বহু ওয়ার্ড অচল। ল্যাব পরীক্ষা, অস্ত্রোপচারসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হচ্ছে প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের অভাবে। একই সঙ্গে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীর সংকটও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।
পুরো গাজা উপত্যকার প্রায় ২০ লাখ মানুষের জন্য এখন রয়েছে মাত্র ২ হাজার ২০০টি হাসপাতালের শয্যা। অথচ যুদ্ধের আগে শুধু আল-শিফা হাসপাতালেই ছিল ৭০০টি শয্যা।
অর্থাৎ সংকটটি শুধু হাসপাতাল ধ্বংস হওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। চিকিৎসা অবকাঠামো, জনবল, সরঞ্জাম, ওষুধ এবং রোগীদের কাছে পৌঁছানোর সক্ষমতা— সব ক্ষেত্রেই সংকট তৈরি হয়েছে।
কেন গুরুত্বপূর্ণ ইউএনআরডব্লিউএর ক্লিনিক
গাজায় প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে দীর্ঘদিন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে ইউএনআরডব্লিউএ। নাকবার পর গাজায় আসা ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের জন্য সংস্থাটি বিভিন্ন শিবিরে ক্লিনিক স্থাপন করেছিল। এসব ক্লিনিকের মাধ্যমে মানুষ বিনামূল্যে প্রাথমিক চিকিৎসাসেবা পেতেন।
এই ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় সুবিধা ছিল, চিকিৎসার জন্য মানুষকে দূরের বড় হাসপাতালে যেতে হতো না। শিবিরের কাছেই প্রাথমিক চিকিৎসা পাওয়া যেত।
আরও পড়ুন
বর্তমান সংকটে সেই স্থানীয় স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোর অনুপস্থিতিই সবচেয়ে বেশি অনুভূত হচ্ছে। হাসপাতাল পুনর্গঠন সময়সাপেক্ষ। কিন্তু প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা তুলনামূলক দ্রুত পুনঃস্থাপন করা সম্ভব।
বাস্তুচ্যুত মানুষের জন্য এমন স্বাস্থ্যকেন্দ্র শুধু চিকিৎসা দেওয়ার জায়গা নয়। সেখানে দীর্ঘমেয়াদি রোগ শনাক্ত করা, নিয়মিত ওষুধ সরবরাহ, শিশুদের সাধারণ রোগের চিকিৎসা এবং গুরুতর অসুস্থতা শুরুর আগেই তা শনাক্ত করা সম্ভব।
স্বাস্থ্যসেবা কি এখন সামর্থ্যের বিষয়?
গাজার বর্তমান বাস্তবতা একটি কঠিন প্রশ্ন সামনে এনেছে— স্বাস্থ্যসেবা কি এখন সবার জন্য সমান?
একদিকে হাসপাতাল ও ক্লিনিকের সংখ্যা কমে গেছে, অন্যদিকে চিকিৎসা নিতে যাওয়া মানুষের অনেকের কাছেই যাতায়াতের খরচ নেই। ফলে চিকিৎসা পাওয়া এখন শুধু অসুস্থতার ওপর নির্ভর করছে না; নির্ভর করছে একজন মানুষ কোথায় আশ্রয় নিয়েছেন, তার কাছে কত অর্থ আছে এবং তিনি কতটা শারীরিকভাবে চলাচল করতে পারেন তার ওপর। ফলে চিকিৎসার অধিকার ধীরে ধীরে একটি বিশেষ সুবিধায় পরিণত হচ্ছে।
যে ৪৬ বছর বয়সী আহত ব্যক্তির জন্য কয়েক ডলারের যাতায়াত খরচও চিকিৎসার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়, গাজার বাস্তুচ্যুত শিবিরগুলোতে এমন মানুষের সংখ্যা কম নয়। বরং যাদের চিকিৎসার প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি, তাদেরই অনেকের স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পৌঁছানোর সক্ষমতা সবচেয়ে কম।
গাজার স্বাস্থ্যব্যবস্থা পুনর্গঠনের আলোচনায় হাসপাতাল পুনর্নির্মাণ স্বাভাবিকভাবেই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু শুধু হাসপাতাল তৈরি করলেই এই সংকটের সমাধান হবে না।
প্রথমেই প্রয়োজন বাস্তুচ্যুত মানুষের কাছে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ফিরিয়ে নেওয়া। শিবিরের আশপাশে অস্থায়ী বা স্থায়ী ক্লিনিক স্থাপন, প্রয়োজনীয় ওষুধ সরবরাহ, দীর্ঘমেয়াদি রোগীদের নিয়মিত চিকিৎসা এবং শিশুদের সংক্রমণ মোকাবিলার ব্যবস্থা করা জরুরি।
একই সঙ্গে নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যকর পরিবেশ নিশ্চিত করাও স্বাস্থ্যব্যবস্থার অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। কারণ দূষিত পানি ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ থেকে ছড়িয়ে পড়া রোগ শুধু হাসপাতালের সংখ্যা বাড়িয়ে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। গাজার স্বাস্থ্যসংকট তাই কেবল হাসপাতালের সংকট নয়; এটি একটি পুরো স্বাস্থ্যব্যবস্থার সংকট।
গাজায় স্বাস্থ্যসেবা পুনর্গঠনের সবচেয়ে জরুরি কাজ হলো সেই মানুষগুলোর কাছে পৌঁছানো, যারা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যেতে পারছেন না।
হাসপাতাল পুনর্নির্মাণের পাশাপাশি প্রয়োজন শিবিরভিত্তিক প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, মোবাইল ক্লিনিক, প্রয়োজনীয় ওষুধ সরবরাহ এবং দীর্ঘমেয়াদি রোগীদের নিয়মিত চিকিৎসার ব্যবস্থা।
কারণ একটি স্বাস্থ্যব্যবস্থার সাফল্য শুধু কতগুলো হাসপাতাল চালু আছে, তা দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। সবচেয়ে অসহায় মানুষটি প্রয়োজনের সময় চিকিৎসা পাচ্ছেন কি না— সেটিই আসল প্রশ্ন।
গাজার বাস্তুচ্যুত মানুষের ক্ষেত্রে সেই প্রশ্নের উত্তর এখনো উদ্বেগজনক। স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার অধিকার যখন মানুষের অবস্থান ও আর্থিক সামর্থ্যের ওপর নির্ভর করতে শুরু করে, তখন তা আর সবার জন্য সমান অধিকার থাকে না— পরিণত হয় বিশেষ সুবিধায়।