নিজস্ব প্রতিবেদক: ভারতের উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল এবং টানা ভারী বর্ষণে সিলেট বিভাগের সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি ঘটেছে। মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জে নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধের অন্তত সাতটি স্থান ভেঙে লোকালয়ে ঢুকে পড়েছে তীব্র স্রোতের পানি। এতে তলিয়ে গেছে হাজারো ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট ও ফসলি জমি। চার জেলায় লাখো মানুষ পানিবন্দি হয়ে মানবিক সংকটে পড়েছেন। এদিকে মৌলভীবাজারের রাজনগরে বন্যার পানিতে ডুবে এক বৃদ্ধার মৃত্যু হয়েছে।
মৌলভীবাজারে মনু ও ধলাই নদীর অন্তত পাঁচটি স্থানে প্রতিরক্ষা বাঁধ ভেঙে যাওয়ায় রাজনগর, কুলাউড়া ও কমলগঞ্জ উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। রাজনগরের একামধু ও উজিরপুর এবং কুলাউড়ার শিকরিয়া এলাকায় মনু নদীর বাঁধ ভেঙে টেংরা ও পৃথিমপাশা ইউনিয়নের অধিকাংশ গ্রাম পানির নিচে চলে গেছে। রাজনগরের আকুয়া গ্রামে ঢলের পানিতে ডুবে এক বৃদ্ধার মৃত্যু হয়।
কমলগঞ্জ উপজেলার মখাবিল এলাকায় ধলাই নদীর দুটি স্থানে ভাঙন দেখা দেওয়ায় ইসলামপুর, আদমপুরসহ আশপাশের ইউনিয়নগুলো প্লাবিত হয়েছে। আদমপুর-ইসলামপুর সড়ক পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থা কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। স্থানীয়দের হিসাবে, রাজনগর ও কমলগঞ্জে অন্তত ১২ হাজার মানুষ পানিবন্দি রয়েছেন। অনেক পরিবার গবাদিপশু নিয়ে বাঁধ ও উঁচু স্থানে আশ্রয় নিয়েছে।
হবিগঞ্জেও বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। সদর উপজেলার লস্করপুর ইউনিয়নের কালীগঞ্জ এলাকায় খোয়াই নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধ ভেঙে অন্তত ১৫টি গ্রামে পানি ঢুকে পড়েছে। এর আগে বানিয়াচং উপজেলার রাধাপুর এলাকাতেও একই নদীর বাঁধ ভেঙে হাওরাঞ্চল প্লাবিত হয়।
বাঁধ ভাঙার ফলে নোয়াবাদ, চরহামুয়া, সুঘর, বনগাঁও, নতুনবাজার, বালিহাটা ও কালীগঞ্জসহ অন্তত ১৫টি গ্রামের বাড়িঘরে কোমরসমান পানি উঠেছে। তলিয়ে গেছে হবিগঞ্জ-মিরপুর সড়কের বিভিন্ন অংশ, ফলে জেলা সদরের সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এছাড়া চুনারুঘাট উপজেলার নালমুখ বাজার এলাকায় খোয়াই নদীর তীব্র ভাঙনে হরিজন সম্প্রদায়ের রবিদাসপাড়ার অন্তত ১৫টি পরিবার এবং কয়েকটি সরকারি স্থাপনা ঝুঁকির মুখে রয়েছে।
সুনামগঞ্জে সুরমা, কুশিয়ারা, বৌলাইসহ ছোট-বড় সব নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, আগামী ৪৮ ঘণ্টায় উজানে আরও ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা থাকায় জেলার বিভিন্ন এলাকায় স্বল্পমেয়াদি বন্যা আরও বিস্তৃত হতে পারে।
ইতোমধ্যে তাহিরপুর উপজেলার গুরুত্বপূর্ণ আনোয়ারপুর সড়ক পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় যোগাযোগ ব্যাহত হচ্ছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় জেলার ১২টি উপজেলায় ১ হাজার ৩১১টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। উদ্ধার কার্যক্রমের জন্য ৪৯২টি নৌযান এবং ১ হাজার ৫৬টি মেডিকেল টিম প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
সিলেট জেলাতেও সুরমা ও কুশিয়ারা নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। কুশিয়ারা নদীর শেরপুর পয়েন্টে পানি বিপৎসীমার মাত্র ১০ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে, যা নতুন করে বন্যার আশঙ্কা বাড়িয়েছে। তবে ভারতের মেঘালয় অংশে বৃষ্টিপাত কিছুটা কমে যাওয়ায় সারি-গোয়াইন ও পিয়াইন নদীর পানি সামান্য হ্রাস পেয়েছে।
জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, সিলেটে ৫৩৭টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এছাড়া অতিবৃষ্টির কারণে পাহাড় ও টিলাধসের ঝুঁকি বিবেচনায় জেলার ১৬০টি টিলাকে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করা হয়েছে। পাদদেশে বসবাসকারী মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরে যেতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাইকিং করা হচ্ছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ধলাই নদীর পানি বিপৎসীমার ৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। খোয়াই নদীর বাল্লা, শায়েস্তাগঞ্জ ও মাছুলিয়া পয়েন্টে পানি বিপৎসীমার অনেক ওপরে রয়েছে। অন্যদিকে সুরমা নদীর পানি সুনামগঞ্জ ও ছাতক পয়েন্টে বিপৎসীমার নিচে থাকলেও গত ২৪ ঘণ্টায় উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড সতর্ক করে জানিয়েছে, বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে মনু ও ধলাই নদীর আরও কয়েকটি ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধ ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে জেলা প্রশাসন দুর্গত এলাকায় শুকনো খাবার ও ত্রাণ বিতরণ শুরু করেছে। পাশাপাশি নিয়ন্ত্রণ কক্ষের মাধ্যমে সার্বক্ষণিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
Leave a Reply